গতির ত্রাসেই সংজ্ঞায়িত যে কিংবদন্তি

‘থমমো’-র বলের মুখোমুখি হওয়া ব্যাটারদের চোখের আতঙ্ক, বুকের ধুকপুকানি, কিংবা চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাঁপকে কখনো পরিসংখ্যান বা সংখ্যা দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়! তাই গতির ত্রাসেই চিরকাল সংজ্ঞায়িত হবে এই কিংবদন্তির ক্যারিয়ার!

গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছেন বোলার, ব্যাটারের চোখ সেদিকেই ধ্যানমগ্ন। পলক ফেললেই বিপদ আছড়ে পড়বে ঘাড়ে। বোলারের রানআপ দেখে মনে হতে পারে, এ আর এমন কী! কিন্তু শেষ কদমেই আসল গল্পের শুরু। স্লিঙ্গি অ্যাকশনে বলটাকে এমনভাবে ছুটতেন, যেন বস্তুটা আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে। জেফ থমসনকে তাই বোলিং মেশিন বলাটাও দোষের নয়!

সময়টা গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশক। বলটা তার হাত থেকে বের হতো কামানের গোলার মত। ব্যাটারের সামনে প্রতিটা সেকেন্ডই গা বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ। এমনই রাজত্ব ছিল থমসনের।

ছোট্ট রানআপ আর অদ্ভুত ‘স্লিঙ্গিং’ অ্যাকশন ছিল মূলত নিউ সাউথ ওয়েলসে ১৯৫০ সালের ১৬ আগস্ট জন্মানো এই ফাস্ট বোলারের শক্তি। জ্যাভলিন থ্রোয়ারের বিশেষ দক্ষতা কাজে লাগিয়ে গুড লেন্থে গতিময় ডেলিভারির সাহায্যে সহজেই তিনি বলকে পাঠিয়ে দিতেন সরাসরি ব্যাটসম্যানের চেহারা কিংবা ক্যাপ বরাবর!

বল বা গতির চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিল থমসনের দর্শন। তিনি অকপটে বলতেন, “আমি পিচের ওপর রক্ত দেখতে পছন্দ করি।” ব্যাটারদের আউট করার চেয়ে শারীরিক আঘাত হেনে ক্রিজে তাঁদের উপস্থিতিকে দুর্বিষহ করে তোলার মাঝে পৈশাচিক আনন্দ পেতেন তিনি। এ কারণে ১৯৭৪-৭৫ মৌসুমের অ্যাশেজ সিরিজে ইংলিশ ব্যাটাররা সিঙ্গেল নিতেই ব্যাপক অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, পাছে পরের ওভারে থমসনের মুখোমুখি হতে হয় এই ভয়ে!

সেসময়কার স্পিডোমিটারগুলো অতটা উন্নত না হওয়ায় নির্ভুলভাবে বলের গতি মাপার সুযোগও কম ছিল। এরপরও সেকেলে প্রযুক্তির যন্ত্রেই ১৯৭৫ সালে তাঁর এক ডেলিভারির গতি ঘণ্টায় ১৬০.৪৫ কিলোমিটার ছিল বলে প্রকাশ্যে আসে। তার পরের বছরই সেই রেকর্ড ভেঙে গড়েন নতুন ইতিহাস, এবারের গতি ঘণ্টায় ১৬০.৫৮ কিলোমিটার!

কিংবদন্তি অজি উইকেটকিপার রড মার্শের দাবি, থমসনের বল অনেক সময় ১৮০ কিলোমিটার গতিও স্পর্শ করত! তৎকালীন নিয়মে ব্যাটারদের প্রান্ত পার হওয়ার পর গতি মাপা হতো বলেই হয়তো রেকর্ড বইয়ে সেই সংখ্যাটা আজও অধরা রয়ে গেছে বলে মত তাঁর।

অজিদের হয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৭২-৭৩ মৌসুমে প্রথম মাঠে নামেন থমসন৷ কিন্তু অফ ফর্মের কারণে দলে জায়গা খোয়ান তিনি। এরপর ১৯৭৪-৭৫ মৌসুমে গতির ঝড় নিয়ে প্রত্যাবর্তন ঘটে এই ডানহাতি পেসারের। সে বছরের অ্যাশেজে একাই ৩৩ উইকেট নিয়ে তিনি প্রমাণ করেন কেন তিনি সবসময় বিধ্বংসী গতিতে বল করতে ভালোবাসেন!

তবে অস্ট্রেলিয়া একাদশে এই পেস দানব একা ছিলেন না। সতীর্থ ডেনিস লিলির সাথে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে ভীতি জাগানিয়া আগ্রাসী বোলিং জুটি। ডন চ্যাপেল থেকে শুরু করে ভিভ রিচার্ডসের মতো তখনকার কিংবদন্তি ব্যাটাররা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, থমসনই ছিলেন তাঁদের দেখা সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার। গতির সংজ্ঞায় তিনি ছিলেন সমসাময়িক সবার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে।

৫১ টেস্টে ২৮ গড় নিয়ে ২০০ উইকেট শিকার কিংবা ৬-৪৬ এর মতো বিধ্বংসী বোলিং ফিগার তাঁর সামর্থ্যের পুরো চিত্রটা তুলে ধরতে পারে না। কারণ, ‘থমমো’-র বলের মুখোমুখি হওয়া ব্যাটারদের চোখের আতঙ্ক, বুকের ধুকপুকানি, কিংবা চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাঁপকে কখনো পরিসংখ্যান বা সংখ্যা দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়! তাই গতির ত্রাসই চিরকাল সংজ্ঞায়িত করবে এই কিংবদন্তির ক্যারিয়ারকে, বলাই বাহুল্য!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link