জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁকটা এসেছিল ক্লাস সিক্সের এক সাধারণ দিনে। কোচ জুয়েল স্যার সেদিন স্কুলে এসেছিলেন খেলোয়াড় বাছাই করতে, জিজ্ঞেস করছিলেন কে কে ক্রিকেট খেলবে। ভিড়ের মধ্যে হাত তোলার সাহস হয়নি নাজমুস সাকিবের। কিন্তু পাশে বসা এক বান্ধবী নাছোড়বান্দা—বারবার বলছিলেন, তুই তো ভালো খেলিস, হাত তোল। সাকিব তবু চুপ ছিলেন। শেষে সেই বান্ধবীই নিজে থেকে স্যারকে বলে দেন, সাকিব ভালো খেলে। ঠিক সেই মুহূর্তেই যেন লেখা হয়ে যায় একটা ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রথম পাতা।
এরপরের গল্পটা এক দুরন্ত কিশোরের বেড়ে ওঠার—খুলনা জেলা অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়কত্ব, বিভাগীয় দলে সুযোগ, বাংলাদেশের জার্সি গায়ে চাপানোর স্বপ্ন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাউন্সারটা এলো মাঠের বাইরে থেকে—বাবার আকস্মিক মৃত্যু। মুহূর্তেই বদলে গেল সব হিসাব। ব্যাট-বল রেখে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হলো, পাড়ি জমাতে হলো মালয়েশিয়ায়, জীবিকার খোঁজে।
সেই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন চাচাতো ভাই আজিজ শেখ, যাঁকে সাকিব ডাকেন বড় ভাই বলে। বাবার মৃত্যুর পর যেভাবে তিনি পুরো পরিবারকে সামলেছিলেন, সেটাই আজও সাকিবের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। অথচ এই আজিজেরও একদিন স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর, পারিবারিক টানাপোড়েনে যা অধরাই থেকে গেছে তাঁর। ভাইয়ের সেই অপূর্ণ স্বপ্নটাকেই যেন নিজের জেদ বানিয়ে নিয়েছিলেন সাকিব—ভাই পারেননি, আমি পারব।

মালয়েশিয়ার এক বেডশিট কারখানায় দিনে চারটা করে কনটেইনার নামাতে হতো তাঁকে, প্রতিটির ওজন চল্লিশ-পঞ্চাশ কেজি। শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ত। তবু রাতে ঘরে ফিরে মোজার ভেতর বল ঢুকিয়ে একা একা নকিং করতেন, চোখ আর ব্যাটের সংযোগটা যেন হারিয়ে না যায়।
সেই জেদই একদিন খুলে দিল ভাগ্যের দরজা। টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলতে গিয়ে পরিচয় হয় এক ক্লাব কর্মকর্তার সঙ্গে, প্রথম ম্যাচেই প্র্যাকটিস ছাড়া করে বসেন ৫০ বলে ১০০ রান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি—ইন্টার-স্টেট টুর্নামেন্টে পরপর দুই বছর শীর্ষ রান সংগ্রাহকদের একজন, তারপর মালয়েশিয়া-এ দলের হয়ে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ৫০ বলে ১২২ রানের বিস্ফোরক ইনিংস। যখন মালয়েশিয়া ক্রিকেট বোর্ডের প্রস্তাব এলো, তখনও ফোন করেছিলেন সেই বড় ভাই আজিজকেই—তাঁর পরামর্শেই এগিয়েছেন ধাপে ধাপে। সেই ইনিংসের পরই এলো জাতীয় দলের ডাক।
আজ সাকিব মালয়েশিয়ার জার্সি গায়ে, কিন্তু ক্রিকেটের শিকড়টা রয়ে গেছে খুলনাতেই। জুয়েল স্যারের একাডেমিতে বিনা পয়সায় গড়ে ওঠা প্রতিভা, মায়ের কানের দুল বিক্রি করে কেনা একটা ব্যাট—এসব স্মৃতিই আজও চোখে জল আনে তাঁর।

বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের বিপক্ষে সিরিজ খেলতে নিজের জন্মভূমিতেই ফিরেছেন সাকিব, তবে প্রতিপক্ষের জার্সিতে। দেশের বিপক্ষে খেলাটা সহজ নয়, নিজেই স্বীকার করেন। তবু মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের মুখে হাসি ফোটাতে চান তিনি, চান নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে বলতে—এই দেশেও একজন বাঙালি ছেলে আছে।
কারখানার শ্রমিক থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার—এই যাত্রাটাই বলে দেয়, স্বপ্নের রং বদলে গেলেও তা মরে যায় না। প্রশ্ন এখন একটাই—নিজের দেশের বিপক্ষে মাঠে নেমে, ভাইয়ের অপূর্ণ স্বপ্ন আর নিজের সংগ্রামের ভার কাঁধে নিয়ে কতটা উজ্জ্বল হবেন সাকিব?












