কখনো তিনি গোল মিস করে নিজের দলের সমর্থকদের হতাশায় ডুবিয়েছেন, কখনো আবার শেষ মুহূর্তে এমন এক গোল করেছেন, যার পর পুরো দেশ আনন্দে কেঁদেছে। কখনো তাঁর নামের পাশে উঠেছে ব্যর্থতার আঙুল, আবার কখনো সেই একই নাম হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার আশার শেষ ঠিকানা।
লাউতারো মার্টিনেজ, ফুটবলের এই চরিত্রটা তাই শুধু এক স্ট্রাইকারের গল্প নয়। বারবার পড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর গল্পও। যিনি সমালোচনাকে সরিয়ে পথ চলের প্রতি মূহুর্তে। দলের প্রয়োজনে ব্যর্থতার মুখোশ খুলে রেখে হয়ে ওঠেন ত্রাতা।
ফুটবলের সঙ্গে লাউতারোর সম্পর্কটা অবশ্য কোনো রাজকীয় গল্পের ভেতর দিয়ে শুরু হয়নি। ১৯৯৭ সালের ২২ আগস্ট আর্জেন্টিনার বাহিয়া ব্লাঙ্কায় জন্ম নেওয়া ছেলেটি বাবার পথ অনুসরণ করে ফুটবলে পা রাখেন। মাত্র নয় বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব লিনিয়ার্সে শুরু হয় তাঁর ফুটবলযাত্রা। ছোট্ট শহর থেকে বড় ফুটবলের স্বপ্ন দেখা সেই ছেলেটি তখনও জানতেন না, একদিন তাঁর পায়ের গোলেই কোটি কোটি আর্জেন্টাইন মানুষের ভাগ্য বদলে যাবে।

লিনিয়ার্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলার সময়ই তাঁর প্রতিভা চোখে পড়ে। ২০১৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ পর্যায়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর নজরে আসেন রেইসিং ক্লাবের। পরের বছর যোগ দেন ক্লাবটিতে। ২০১৫ সালে আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগে অভিষেক। এরপর ধীরে ধীরে নিজেকে প্রমাণ করতে থাকেন। রেইসিংয়ের হয়ে ৪৮ ম্যাচে ২২ গোল, সংখ্যাটা হয়তো আজকের লাউতারোকে বোঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়, কিন্তু সেই সময়ই বড় ক্লাবগুলোর চোখে পড়ে যায় তাঁর নাম।
এমনকি ইউরোপের অন্যতম সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদও তাঁকে দলে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু তখনও লাউতারো নিজের পথটা নিজেই বেছে নিয়েছিলেন। প্রস্তাব ফিরিয়ে রেইসিংয়ে থেকে যান। হয়তো সেদিন তিনি জানতেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে, কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার ছিল, নিজের সিদ্ধান্তের ওপর তাঁর বিশ্বাস ছিল।
২০১৮ সালে সেই বিশ্বাস তাঁকে নিয়ে যায় ইতালিতে। প্রায় ২২.৭ মিলিয়ন ইউরোতে ইন্টার মিলানে যোগ দেন লাউতারো। আর সান সিরোর নীল-কালো জার্সিই যেন তাঁর ক্যারিয়ারের আসল দরজা খুলে দেয়।

ইন্টারে প্রথমদিকে তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেন গোল দিয়ে। রোমেলু লুকাকুর সঙ্গে তাঁর জুটি হয়ে ওঠে ইউরোপের অন্যতম ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগ। ২০২০–২১ মৌসুমে ইন্টার যখন ১১ বছরের সিরি আ শিরোপার খরা কাটাল, তখন লাউতারো ছিলেন সেই দলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র।
লুকাকু চলে যাওয়ার পর অবশ্য গল্পটা আরও কঠিন হয়ে যায়। এবার তাঁকেই হয়ে উঠতে হয় ইন্টারের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। আর সেই দায়িত্ব থেকেই জন্ম নেয় আরও পরিণত এক লাউতারোর। গোলের পাশাপাশি লিংক–আপ প্লে, প্রেসিং, প্রতিপক্ষের রক্ষণে জায়গা তৈরি করা—সবকিছুতেই নিজেকে বদলাতে থাকেন তিনি।
একসময় যে তরুণকে শুধু গোল করার জন্য মাঠে নামানো হতো, সে–ই হয়ে ওঠেন পুরো আক্রমণভাগের নেতা। সিরি আ শিরোপা, কোপা ইতালিয়া, ব্যক্তিগত গোল্ডেন বুট—একটার পর একটা সাফল্য তাঁর ক্যারিয়ারের পাতায় যোগ হতে থাকে। কিন্তু ক্লাব ফুটবলের এই লাউতারো আর জাতীয় দলের লাউতারো যেন একই মানুষ হয়েও দুই ভিন্ন গল্প।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। আর সেই প্রত্যাশার চাপই কখনো কখনো তাঁকে ভেঙে দিয়েছে। গোলের সহজ সুযোগ নষ্ট করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছেন, সমর্থকদের দুয়ো শুনেছেন। এমনকি একটা সময় এমনও মনে হয়েছিল—আর্জেন্টিনার মতো দলের প্রধান স্ট্রাইকার হওয়ার চাপটা হয়তো লাউতারো সামলাতে পারছেন না। ২০১৮ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর বিশ্বকাপের মূল স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়া ছিল সেই যাত্রার প্রথম বড় ধাক্কা। পরে নিয়মিত দলে এলেও গোলের ধারাবাহিকতা সবসময় ধরে রাখতে পারেননি।
তারপর এল ২০২২ বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের বিপক্ষে তাঁর গোল অফসাইডে বাতিল হলো। পরের ম্যাচগুলোতেও কাঙ্ক্ষিত ছন্দে পাওয়া গেল না তাঁকে। ধীরে ধীরে একাদশ থেকে সরে গেলেন। তাঁর জায়গা নিলেন জুলিয়ান আলভারেজ। একজন স্ট্রাইকারের জন্য এর চেয়ে বড় আঘাত আর কী হতে পারে?
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে দলের প্রথম পছন্দের স্ট্রাইকার থেকে বেঞ্চের খেলোয়াড় হয়ে যাওয়া—লাউতারোর জন্য সেটিই ছিল বাস্তবতা।

কিন্তু এখানেই তাঁর গল্পটা অন্যদের থেকে আলাদা।তিনি হারিয়ে যাননি। বেঞ্চে বসে থাকা সেই সময়টাকে হয়তো তিনি নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে নেননি; নিয়েছিলেন নিজেকে নতুন করে গড়ার সময় হিসেবে।
২০১৯ কোপা আমেরিকায় গোল করে আর্জেন্টিনাকে নকআউট পর্বে তুলেছেন, ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে করেছেন গুরুত্বপূর্ণ গোল। কিন্তু আসল প্রত্যাবর্তনটা এসেছে ২০২৪ কোপা আমেরিকায়। সেই আসরে লাউতারো যেন পুরোনো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে নেমেছিলেন।
গ্রুপ পর্বে গোল। এরপর ফাইনাল। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছে, তখনও দুই দলকে আলাদা করার মতো কিছু নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে ১১২তম মিনিটে লাউতারোর পা থেকে এল সেই গোল। একসময় যাঁর গোল মিস নিয়ে আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা হতাশ হতেন, সেই মানুষটিই এবার একটি গোল দিয়ে দেশকে এনে দিলেন আরেকটি মহাদেশীয় শিরোপা। পাঁচ গোল করে জিতলেন গোল্ডেন বুটও। সেটা শুধু একটি ব্যক্তিগত পুরস্কার ছিল না। ছিল বহুদিনের সমালোচনার জবাব।

২০২৬ বিশ্বকাপেও যখন আর্জেন্টিনার প্রয়োজন হয়েছে, তখন আবার সামনে এসেছেন তিনি। গ্রুপ পর্বে গোল, মিশরের বিপক্ষে বিপদের মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসিস্ট, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোল, প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাঁর ক্যারিয়ারের পুরোনো গল্পটাকেই নতুন করে লিখেছে। যে একসময় সুযোগ নষ্ট করে সমালোচিত হয়েছেন, সেই এখন বড় ম্যাচে সুযোগ তৈরি করেন, গোল করেন, সতীর্থকে গোল করান। এটাই হয়তো লাউতারো মার্টিনেজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
তিনি নিখুঁত নন। তিনি সব ম্যাচে গোল করেন না। সবসময় ছন্দে থাকেন না। কখনো কখনো এমন সুযোগও নষ্ট করেন, যা দেখে একজন সমর্থক মাথায় হাত দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তাঁর গল্পটা বারবার বদলে যায়।










