৪৮ বছরের দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার পর ২০০২ সালের বিশ্বকাপে পা রেখেই বিশ্ব ফুটবলকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল তুরস্ক।সেনোল গুরনেসের লাল-সাদা সেনারা কেবল প্রতিযোগী হিসেবে এশিয়ার মাঠে নামেনি, তারা এসেছিল বোসফরাসের হুঙ্কার শোনাতে। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে কড়া টক্কর দিয়ে তুরস্ক পরিষ্কার বার্তা দিয়েছিল – তারা কোনো সাধারণ দল নয়। বিতর্কিত পেনাল্টি আর দুটো লাল কার্ড সত্ত্বেও ব্রাজিলকে প্রায় থমকে দিয়েছিল এই উদীয়মান শক্তিটি।
গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে নকআউটে পা রাখার পর থেকেই শুরু হয় তুর্কি সিপাহীদের আসল তাণ্ডব। স্বাগতিক জাপানকে তাদেরই ঘরের মাঠে ১-০ গোলে স্তব্ধ করে দিয়ে শেষ আটে পৌঁছানো ছিল কেবল ঝড়ের পূর্বাভাস।
এরপর সেনেগালের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ইলহান মানসিজের সেই রক্তহিম করা ‘গোল্ডেন গোল’ কেবল জাল স্পর্শ করেনি, পুরো ইস্তাম্বুল থেকে আনকারা পর্যন্ত উল্লাসের দাবানল জ্বালিয়ে দিয়েছিল। প্রতিটি ক্ষণে ফুটবল বিশ্ব দেখেছিল রূপালী পর্দার দুর্দান্ত এক রোমাঞ্চকর থ্রিলার।

সেমিফাইনালে আবারো আসে ব্রাজিল বাধা। ব্রাজিলীয় জাদুকর রোনালদোর একক নৈপুণ্যে ১-০ ব্যবধানে হেরেই স্বপ্নের ফাইনাল হাতছাড়া হয় তুর্কিদের। কিন্তু ঐতিহাসিক সেই ট্র্যাজেডি তাদের মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে পারেনি।
নাটকের শেষ ও স্মরণীয় অঙ্কটি রচিত হয় ডায়েগু স্টেডিয়ামে, স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজার মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় অধিনায়ক হাকিম সুকুর গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্রুততম গোলের এক চিরস্থায়ী রেকর্ড গড়ে অমর হয়ে থাকেন। এরপর ইলহান মানসিজের জোড়া গোলে কোরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক ছিনিয়ে নেয় গুরনেসের দল।
চোখের নিচে যুদ্ধংদেহী কালো ছোপ এঁকে রুস্তু রেচবারের প্রাচীরের মতো অবিশ্বাস্য গোলকিপিং, হাসান সাসের ক্ষুরধার গতিশীল ড্রিবলিং, তুগাই কেরিমোগলুর মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ আর ইলহান মানসিজের নান্দনিক গোল ২০০২ বিশ্বকাপকে এক রাজকীয় রূপ দিয়েছিল।

টুর্নামেন্ট শেষে বিজয়ী তুর্কি খেলোয়াড়রা মাঠেই কোরিয়ান জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে গ্যালারি প্রদক্ষিণ করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছিল ক্রীড়াসুলভ সৌজন্যতার অনন্য উদাহরণ। সোনালী ট্রফিটি হয়তো ইস্তাম্বুলে পৌঁছায়নি, কিন্তু বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম চিরকালের জন্য সোনার অক্ষরে খোদাই করে নিয়েছিল অদম্য তুরস্ক।











