ভস্ম থেকে রাজসিংহাসনে লেস্টারের নীল ফিনিক্স

দলটি তার আগের মৌসুমে কোনোমতে রেলিগেশন বাঁচিয়ে ১৪তম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করেছিল, তারাই সব হিসেব-নিকাশ উল্টে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তুলে নেয় তাদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনা হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে ২০১৫-১৬ মৌসুমের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে লেস্টার সিটির শিরোপা জয়ের অনন্য রূপকথা। মৌসুম শুরু হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষক কিংবা সমর্থকদের কল্পনায়ও তাদের লিগ জয়ের কোনো সম্ভাবনা ছিল না। যে দলটি তার আগের মৌসুমে কোনোমতে রেলিগেশন বাঁচিয়ে ১৪তম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করেছিল, তারাই সব হিসেব-নিকাশ উল্টে দিয়ে শেষ পর্যন্ত তুলে নেয় তাদের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম প্রিমিয়ার লিগ ট্রফি।

ইতালীয় কোচ ক্লাউডিও রানিয়েরি দায়িত্ব নেওয়ার পর লেস্টার সিটির খেলার ধরণে আসে আমূল পরিবর্তন। কম পজেশন রেখে দ্রুতগতির কাউন্টার-অ্যাটাকিং ফুটবলের মাধ্যমে তারা একের পর এক পরাশক্তিকে পরাস্ত করতে থাকে। পুরো মৌসুমে ৩৮টি ম্যাচ খেলে লেস্টার সিটি ২৩টিতে জয় পায়, ১২টিতে ড্র করে এবং মাত্র তিনটি ম্যাচে পরাজয় বরণ করে।

দ্বিতীয় স্থানে থাকা আর্সেনালের চেয়ে পরিষ্কার দশ পয়েন্টে এগিয়ে থেকে মোট ৮১ পয়েন্ট অর্জন করে তারা শিরোপা নিশ্চিত করে। সে মৌসুমে তারা ৬৮টি গোল করার পাশাপাশি হজম করেছিল ৩৬টি গোল, আর তাদের গোলপোস্ট অক্ষত ছিল ১৫টি ম্যাচে। সাধারণত শক্তিশালী দলগুলোর বল পজেশন বেশি থাকলেও লেস্টার মাত্র ৪২.৪৩ শতাংশ গড় পজেশন নিয়েও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভূতপূর্ব কীর্তি গড়ে।

​কোচ ক্লাউডিও রানিয়েরি পুরো মৌসুমে খুব বেশি একাদশ পরিবর্তন না করে একটি সুসংগঠিত ৪-৪-২ ফরমেশনে আস্থা রেখেছিলেন। গোলপোস্টের নিচে ক্যাসপার স্মাইকেল ছিলেন দুর্ভেদ্য প্রাচীর, আর সেন্ট্রাল ডিফেন্সে অধিনায়ক ওয়েস মরগান ও রবার্ট হুথ প্রতিপক্ষের প্রতিটি আক্রমণ রুখে দিতে বড় ভূমিকা রাখেন।

রক্ষণের দুই পাশে ড্যানি সিম্পসন ও ক্রিশ্চিয়ান ফুখস দারুণ ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন। মাঝমাঠে এনগোলো কান্তে ছিলেন দলের প্রধান চালিকাশক্তি, যিনি পুরো লিগে সবচেয়ে বেশি ট্যাকেল ও ইন্টারসেপশন করেন। তার সাথে ড্যানি ড্রিঙ্কওয়াটারের পাসের দূরদর্শিতা এবং উইংয়ে মার্ক অ্যালব্রাইটন ও রিয়াদ মাহরেজের দুর্দান্ত গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার ছন্নছাড়া করে দেয়।

লেস্টার সিটির এই ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল জেমি ভার্ডি ও রিয়াদ মাহরেজ জুটির। ইংলিশ ফরোয়ার্ড জেমি ভার্ডি সেই মৌসুমে মোট ২৪ টি গোল করেন এবং প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে টানা ১১ ম্যাচে গোল করার ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ে তোলেন। অন্যদিকে, আলজেরিয়ান উইঙ্গার রিয়াদ মাহরেজ ১৭ টি গোল করার পাশাপাশি ১১ টি গোলের পথ তৈরি করে দেন, যার সুবাদে তিনি সে বছর পিএফএ বর্ষসেরা ফুটবলারের খেতাব জয় করেন।

​২০১৬ সালের ২ মে টটেনহ্যাম হটস্পার ও চেলসির মধ্যকার ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হওয়ার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায় লেস্টার সিটির শিরোপা জয়। সীমিত বাজেট ও সাধারণ দল নিয়েও যে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা, নিখুঁত কৌশল ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠা যায়, লেস্টার সিটির এই অবিশ্বাস্য বিজয় তারই এক অমর দৃষ্টান্ত।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link