সীমানার কাছে ছুটে যাওয়া বলকে রুখতে ডাইভ দিচ্ছেন এক অতিমানব। আবার কখনো ভাসছেন হাওয়ায় বলকে স্টাম্পের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে। ক্রিকেট ইতিহাসে ফিল্ডিংকে এমন শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়ের নাম জন্টি রোডস। অথচ এই উড়ন্ত মানব হতে চেয়েছিলেন পেশাদার ফুটবলার। ঘরের দেয়ালে ছিল কেভিন কিগানের মতো তারকার পোস্টার।
কিন্তু পাঁচ বছর বয়সের এক দুর্ঘটনা বদলে দেয় জীবনের গতিপথ। ধরা পড়ে ‘রিফ্লেক্সিভ এপিলেপসি’। মাথায় আঘাত পাওয়ার ভয়ে ফুটবল বা রাগবি খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন চিকিৎসক। কিন্তু খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা ছাড়তে পারেননি ১৯৭৯ সালে জন্মানো এই প্রোটিয়া তরুণ। চলে আসেন ক্রিকেটে। কিন্তু বিধি বাম! ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর দেশটির ঘরোয়া লিগে ন্যাটালের হয়ে এক ম্যাচে অ্যালান ডোনাল্ডের বাউন্সারে মাথায় চোট পেয়ে জ্ঞান হারান তিনি। এক রাত হাসপাতালে কাটাতে হয় জন্টিকে।
ন্যাটালের হয়ে খেলার সময়েই জন্টি তখনকার অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক কিম হিউজের ইতিবাচক খেলার ধরন থেকে অনুপ্রাণিত হন। ক্লাইভ রাইস আর ক্যারিবীয় তারকা ম্যালকম মার্শালের কাছ থেকেও ক্রিকেট ও ফিল্ডিংয়ের নানা কারিকুরি শেখেন তিনি।

এরপর আসে ১৯৯২ বিশ্বকাপ। আসরটিতে স্রেফ একটা প্রথম শ্রেণির সেঞ্চুরি নিয়ে প্রোটিয়া স্কোয়াডে জন্টির সুযোগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কিংবদন্তি গ্রায়েম পলোক। তাঁর মতে, জন্টি কেবল একজন ফিল্ডার ছিলেন, যে কি না কিছুটা ব্যাটিং করতে জানতো। কিন্তু সিডনিতে তাঁর অতিমানবীয় ফিল্ডিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ তছনছ করে দেওয়া কিংবা ইনজামামকে সেই ‘সুপারম্যান’ ডাইভ দিয়ে আউট করার মতো দৃশ্যগুলো সব হিসেব বদলে দেয়। তিনি রাতারাতি হয়ে ওঠেন দক্ষিণ আফ্রিকার বৈশ্বিক আইকন।
বিশ্বকাপ থেকে ফিরে জন্টি রোডসের অভিষেক হয় টেস্টে। অভিষেক ইনিংসে অনিল কুম্বলের বলে স্টাম্পের পিছনে ক্যাচ দিয়ে ৪১ রানে থামেন তিনি। তবে ফিল্ডিংয়ে নেমেই নিজের জাত চেনান রোডস। ১৯ বছরের তরুণ শচীন টেন্ডুলকার তাঁর দিকে বল ঠেলে দিয়ে সিঙ্গেল নিতে দৌঁড়ালে তিনি ত্বরিত গতিতে তা কুড়িয়ে পাঠান অ্যান্ড্রু হাডসনের কাছে। হাডসন নিঁখুতভাবে ভেঙে দেন স্টাম্প। ফিরে যান শচীন।
জন্টি কেবল ক্রিকেটার ছিলেন না, ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ। ১৯৯৮ সালে ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হেরেও তিনি ড্রেসিংরুমে লুকাননি। হাসিমুখে প্রতিপক্ষের প্রশংসা করেছেন। এমনকি অকপটে স্বীকার করেছেন তৎকালীন বর্ণবাদী সমাজে ‘শ্বেতাঙ্গ সুবিধা’ পাওয়ার কথাও।

মাত্র দুটি টেস্ট শতক নিয়েও রোডস অনবদ্য হয়ে উঠেছেন তাঁর অতিমানবীয় ফিল্ডিং ক্যারিশমার কারণে। তাই এই কিংবদন্তির নাম যখনই উচ্চারিত হয়, তখনই জেগে ওঠে ক্রিকেটের চিরন্তন প্রাণশক্তি!










