বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ভিলেন এখন আর্জেন্টিনা?

‘ঘৃণার অ্যালগরিদম’-এর নতুন শিকার এখন আর্জেন্টিনা। অথচ, একটা সময় বিশ্বকাপ মানেই ছিল আর্জেন্টিনার জাদু, লিওনেল মেসির ম্যাজিক আর কোটি কোটি নিরপেক্ষ দর্শকের সমর্থন। ২০২২ সালে কাতারে শিরোপা জয়ের পর তো মনে হয়েছিল, লিওনেল মেসি অবশেষে ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটার সমাপ্তি টানলেন পূর্ণতা দিয়ে।

কিন্তু, চার বছর পর চিত্রটা যেন পুরো উল্টো গেল, পাশার দান পাল্টে গেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হওয়া শব্দগুলোর একটি—‘আর্জেন্টিনা হেট’। কেউ কেউ লিখছে, ‘পুরো পৃথিবী আর্জেন্টিনাকে ঘৃণা করে।’

কেউ দাবি করছে, ‘এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত দেশ আর্জেন্টিনা।’ আবার কেউ বিস্ময় প্রকাশ করে বলছে, ‘মেসি বা আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যত অযৌক্তিক ঘৃণার পোস্ট, সবই লাখ লাখ রিঅ্যাকশন পাচ্ছে!’

এমনকি নতুন একটা শব্দও তৈরি হয়েছে—‘হেট-ওয়াচিং আর্জেন্টিনা’। অর্থাৎ, আর্জেন্টিনার খেলা দেখে যারা, তাঁরা শুধুই আর্জেন্টিনার হার প্রত্যাশা করে। সমর্থনের চেয়ে ঘৃণাই এখন বেশি এন্টারটেইনিং।

মজার বিষয় হল, আর্জেন্টিনা যত জিতছে, ততই যেন বাড়ছে এই বিদ্বেষ। প্রতিটি জয় নতুন করে জন্ম দিচ্ছে ট্রোল, মিম আর বিতর্কের। একজন লিখেছেন, ‘আর্জেন্টিনা যদি মাঠে একাই খেলেও আমি স্টেডিয়ামের পক্ষ নেব।’

আরেকজনের কটাক্ষের ভাষাটা এমন, ‘মানুষ এখন নিজের দলকে যতটা ভালোবাসে, তার চেয়ে বেশি সময় দেয় আর্জেন্টিনাকে ঘৃণা করতে। যেন এটা একটা ফুল-টাইম চাকরি।’

তাহলে হঠাৎ এমন পরিবর্তন কেন? উত্তরটা শুধু আর ফুটবলে নেই। ২০২২ সালের পর বিশ্বরাজনীতি, জাতীয়তাবাদ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভাজন ফুটবলের সীমানা ভেঙে দিয়েছে। গাজা, ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের নানা সংকট—সবকিছুর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিশ্বকাপের আলোচনাতেও।

এই টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে পড়েছেন লিওনেল মেসিও। পুরোনো ছবি, পুরোনো সফর, পুরোনো সাক্ষাৎ—সব আবার নতুন করে ভাইরাল হচ্ছে। ইসরায়েলে মেসির সফর কিংবা ইসরায়েলি নেতাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ছবি নতুন বিতর্ক উসকে দিচ্ছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই তৈরি একটি ভুয়া ছবিও অনেকের কাছে সত্যি হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আছেন।

ফুটবলের বাইরের ক্ষোভও তাই এসে মিশছে ফুটবলের ভেতরে। আর্জেন্টিনার ইউরোপীয় পরিচয়, দেশটির বর্ণ ও জাতিগত ইতিহাস—এসব বিষয়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে।

মাঠের লড়াইও বিতর্কমুক্ত থাকেনি। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচের পর দেশটির কোচ হোসাম হাসান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ফিফার বর্ণবাদবিরোধী সংকেত দেখিয়ে তিনি প্রতিবাদ করেন। ম্যাচজুড়ে মেসির কিছু আচরণ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে, যদিও সেগুলোর অনেকগুলোর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

মিশরের বিদায়ের পর কিছু সমর্থক মেসির জার্সি পুড়িয়েছেন, কেউ আবার সেই জার্সিকে পাপোশ বানিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এদিকে অনলাইনে আরও চরম তুলনাও দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে আর্জেন্টিনা হল লাতিন আমেরিকার ইসরায়েল। এই ঘৃণার মিছিলেই আর্জেন্টিনা নাম লিখিয়েছে সেমিফাইনালে।

এর মাঝেই জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন মিম, নতুন নতুন বিভাজন। তবে প্রশ্নটা থেকেই যায়— আসলেই কি পুরো পৃথিবী আর্জেন্টিনাকে ঘৃণা করে? নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম শুধু ঘৃণাকেই বেশি দৃশ্যমান করে তুলছে? অন্তত, বাংলাদেশ কিংবা উপমহাদেশিয় অনেক দেশ থেকেই মেসিরা অনেক ভালোবাসাও পাচ্ছে। তবে, ইন্টারনেট দুনিয়ায় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই ভালোবাসা এই মুহূর্তে যথেষ্ট নয়।

– দ্য টেলিগ্রাফ অবলম্বনে

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link