সিডনি টেস্টের শেষ মুহূর্তে জয়ের রানটা যখন এল, ড্রেসিংরুমের এক কোণে দুজন মানুষের চোখ চিকচিক করছিল। মোহাম্মদ আশরাফুল আর তালহা জুবায়ের। আর এই দৃশ্যটাই যেন প্রমাণ করে দিল একটা কথা—দেশি কোচ আসার পর থেকে বাংলাদেশের ব্যাটিং আর বোলিংয়ে যে পরিবর্তন চোখে পড়ছে, সেটা কাকতালীয় নয়, বরং একটা সচেতন দর্শনের ফসল।
এই দুজনের সাফল্যটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বিসিবির একটা বড় পরিকল্পনার অংশ। বছরের পর বছর ধরে বিদেশি কোচদের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের যে দূরত্বটা থেকে গিয়েছিল, তার মূলে ছিল ভাষা আর মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা। বেশিরভাগ তরুণ ক্রিকেটার ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন, ফলে বিদেশি কোচের কথাই যদি বুঝতে না পারেন, নিজের সমস্যাটা তাকে কীভাবে বোঝাবেন?
আর টেকনিক্যাল-সাইকোলজিক্যাল যে সংকটগুলো একান্তে বসে খোলাখুলি আলোচনা করা দরকার, সেখানে একজন রাগী ‘হেডমাস্টার’ নয়—তরুণদের দরকার হয় একজন বন্ধু, একজন বড়ভাই। এই উপলব্ধি থেকেই বিসিবি এখন ধাপে ধাপে গড়ে তুলছে দেশি কোচদের একটা বলয়।
মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ এখন যুব দল ও হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের মেন্টর, ইমরুল কায়েস যুক্ত হয়েছেন সহকারী কোচ হিসেবে—যাদের খেলতে দেখে এই প্রজন্মের ক্রিকেটাররা বড় হয়েছে, ফলে একটা আইডলাইজেশনের জায়গা থেকেই তরুণরা তাদের কথা শোনে, মানে। আশরাফুল আর তালহা জুবায়ের এই বৃহত্তর কাঠামোরই সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই মুখ।

গল্পটা অবশ্য শুরু হয়েছিল অবিশ্বাসের চাদর গায়ে জড়িয়ে। শন টেইট পারিবারিক কারণ দেখিয়ে হঠাৎই সরে দাঁড়ালেন, আর তার জায়গা নিলেন তালহা জুবায়ের—যাকে অনেকেই তখন চিনতেনই না ভালোমতো। আশরাফুলের বেলাতেও প্রশ্ন কম ওঠেনি। মানুষ চেয়েছিল আরও একজন নামী বিদেশি মুখ, বড় বড় ক্রেডেনশিয়ালওয়ালা কেউ।
অথচ ফলাফল বলছে অন্য কথা। জিম্বাবুয়ে সফরে বাউন্সি উইকেটে খাবি খাওয়া, সিএ একাদশের বিপক্ষে চুয়ান্ন রানে অলআউট হওয়ার দু:স্মৃতি ঝেড়ে ফেলে স্টার্ক-কামিন্স-হ্যাজলউডের সামনে বাউন্ডারির লোভ সংবরণ করে সিঙ্গেল-ডাবলে রান বাড়ানোর যে পরিণত ব্যাটিং বাংলাদেশ দেখাল, তার পেছনে আশরাফুলের অভিজ্ঞতার আলো।
আর মুস্তাফিজ-তাসকিন বাদে জাতীয় দলের প্রায় প্রতিটি পেসারের সঙ্গে বয়সভিত্তিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটে কাজ করা তালহা জুবায়ের, যার অধীনেই নাহিদ রানা পেয়েছিলেন বিপিএলে প্রথম সুযোগ, এবার রানা-শরীফুলের মতো স্পিয়ারহেড ছাড়াই তিন সিমার দিয়ে হেড-স্মিথ-লাবুশেনদের ঘাম ছোটানোর কৌশল বানালেন নিখুঁত পরিকল্পনায়।
আর ভারতের ইতিহাস তো এই স্বপ্নকে আরও জোরালো করে। গৌতম গম্ভীরের আগে সেই চেয়ারে বসেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়—নিজেদেরই সাবেক ব্যাটিং কিংবদন্তি। তার কোচিংয়েই ২০২৪ সালে বার্বাডোজে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে এগারো বছরের আইসিসি ট্রফি-খরা ঘোচায় ভারত। বিদেশি মোড়ক ছাড়াই, নিজেদের ঘরের মানুষ দিয়েই সেদিন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন সত্যি করেছিল টিম ইন্ডিয়া।

তাহলে প্রশ্নটা এখন আর অমূলক থাকে না। রাহুল দ্রাবিড় যদি ভারতকে এগারো বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপ এনে দিতে পারেন, আশরাফুল-তালহারা যদি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস লিখে ফেলতে পারেন—তবে বাংলাদেশও কি একদিন স্বদেশি কোনো কোচের হাত ধরেই দেখবে না আইসিসি ট্রফি হাতে তোলার সেই চিরকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত?











