রাজকীয় একাকীত্বে মোড়ানো এক ট্র্যাজিক হিরো

পরিসংখ্যানের জাদুকরী ছোঁয়ায় তিনি কিংবদন্তি রিভালদোকে ছুঁয়েছেন, ছাড়িয়ে গেছেন রোমারিও-গারিঞ্চাদের। তবুও সোনালী ট্রফির এক পশলা বৃষ্টির জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা নেইমার যেন আজ এক ট্র্যাজিক হিরো

নেইমার যেন দুই দশকের ব্রাজিলীয় ফুটবলের এক নি:সঙ্গ উপাখ্যান। পরিসংখ্যানের জাদুকরী ছোঁয়ায় তিনি কিংবদন্তি রিভালদোকে ছুঁয়েছেন, ছাড়িয়ে গেছেন রোমারিও-গারিঞ্চাদের। তবুও সোনালী ট্রফির এক পশলা বৃষ্টির জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকা নেইমার যেন আজ এক ট্র্যাজিক হিরো। যিনি বারবার তীরের খুব কাছে এসেও তরী ডুবতে দেখেছেন।

নেইমারের গল্পটা কেবল সাফল্যের নয়, বরং এক রাজকীয় একাকীত্বের। পেলের উত্তরসূরি হিসেবে পঁচিশ বছর আগে যে মশালটি জ্বলেছিল, নেইমার যখন সেটি হাতে নেন, পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো মহীরুহ ছিল না।

১৯৫৮ বা ২০০২ এর জয়ে কিংবদন্তিদের যে সংহতি ছিল, নেইমারের যুগে তা ছিল অনুপস্থিত। রোনালদিনহো বা কাকার মতো নক্ষত্ররা যখন কক্ষপথ থেকে ছিটকে গেলেন, তখন এক ধূসর সাম্রাজ্যের সিংহাসন রক্ষায় নেইমারই হয়ে উঠেছিলেন একমাত্র সেনাপতি।

২০১৪ সালে ঘরের মাঠে পেলের সেই দশ নম্বর জার্সিটি যখন তার গায়ে উঠল, তখন গোটা জাতির স্বপ্ন ছিল তার পায়ে বন্দি। কিন্তু কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেই মেরুদণ্ড ভাঙা আঘাত যখন তাকে ছিটকে দিল, তখনই বেরিয়ে পড়ে ব্রাজিলের নেইমার-নির্ভরতার  কঙ্কালসার রূপ। বেলো হরিজন্তের সেই ১-৭ গোলের কলঙ্কিত রাত প্রমাণ করেছিল – নেইমারহীন ব্রাজিল আদতে এক সুরহীন বাদ্যযন্ত্র।

রাশিয়া থেকে কাতার – নেইমারের প্রতিটি বিশ্বকাপ অভিযানই যেন এক একটি অসমাপ্ত বিয়োগান্তক নাটক। কখনও অতিরঞ্জিত যন্ত্রণার দায়ে বিদ্ধ হওয়া, কখনও অবিশ্বাস্য গোলেও টাইব্রেকারের নিষ্ঠুরতায় কপাল পোড়া।

কাতারে ক্রোয়েশিয়ার জালে বল পাঠিয়ে যখন তিনি অমরত্বের গান গাইছিলেন, ঠিক তখনই ভাগ্যের পরিহাসে সব সুর কেটে গেল। এরপর আল হিলালের প্রবাস জীবন কিংবা এসিএল ইনজুরির দীর্ঘ অন্ধকার – সব মিলিয়ে নেইমারের ক্যারিয়ারের শেষ বিকেলটা যেন বড্ড বেশি মেঘলা।

উত্তর আমেরিকার আকাশে যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের মেঘ জমছে, ব্রাজিলের অন্দরে তখন পালাবদলের হাওয়া। ভিনিসিয়াস বা রদ্রিগোদের মতো তরুণ তূর্যরা এখন পাদপ্রদীপের আলোয়। নেইমারকে ছাড়াই পথ চলার এক কঠিন পাঠ নিচ্ছে সেলেসাওরা। কিন্তু ভিনিসিয়াসদের গতির ঝড়ে আজও কি নেইমারের সেই শিল্পিত তুলির টান অনুভূত হয় না?

৩৪ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে, শরীরজুড়ে অসংখ্য চোটের ক্ষত নিয়ে নেইমার কি পারবেন শেষবার সেই হলুদ জার্সিতে বসন্ত নামাতে? উত্তরটা হয়তো মহাকালের কাছে। তবে ইতিহাস মনে রাখবে এমন এক শিল্পীকে, যিনি একাই একটি প্রজন্মের আবেগ ও ২০ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে নিজের ভঙ্গুর কাঁধে বয়ে চলেছেন।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

জীবন তড়িৎ কোষে অ্যানোডে ক্রীড়ার উন্মাদনা আর ক্যাথোডে সাহিত্যের স্নিগ্ধ নির্যাস।

Share via
Copy link