ঢুঁসকাণ্ড ছাপিয়েও যেভাবে ভাস্বর মাতেরাজ্জি

জিদানের সাথে ২০০৬ সালের সেই তিক্ততা ছাপিয়ে আলেসান্দ্রো নেস্তা, আন্দ্রে পিরলো, টট্টি কিংবা ফিলিপো ইনজাঘিদের মতো মাতেরাজ্জিও ইতালির সোনালী প্রজন্মের ফুটবলারদের এক অবিচ্ছেদ্য আইকন।

২০০৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল। বার্লিনে তখন বইছে ফুটবলীয় উন্মাদনার হাওয়া। বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে একটাই প্রশ্ন—ফরাসি তারকা জিনেদিন জিদান কি আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে ক্যারিয়ারের বর্ণিল ইতি টানবেন? কিন্তু, না! অপ্রত্যাশিত ঢুঁসকাণ্ডে ভেস্তে গেল সব। অতিরিক্ত সময়ে এক নিকটাত্মীয়কে নিয়ে বাজে মন্তব্য করায় মেজাজ হারিয়ে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে ঢুঁস মারেন তিনি। ফলাফল? লাল কার্ড দেখে মাঠ ত্যাগ আর টাইব্রেকারে সেই মাতেরাজ্জিদের শিরোপা জয়!

এ ঘটনার পর মাতেরাজ্জি দৃশ্যত ‘খলনায়ক’ বনে গেলেও, রক্ষণে তাঁর অদম্য লড়াকু মানসিকতায় খেলার প্রশংসা না করে কোনো উপায় নেই। স্রেফ জিদানের ঢুঁস হজমের জন্য তাঁর ক্রীড়াশৈলী ও খেলার ধরনকে অবজ্ঞা করাও তাই চরম অবিচার!

১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট ইতালির লেচেতে জন্মানো মাতেরাজ্জির প্রধান অস্ত্র ছিল শারীরিক শক্তিমত্তা। আগ্রাসী রক্ষণ আর দুর্দান্ত ইন্টারসেপশানে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য৷ কঠোর ট্যাকলিং আর প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মার্ক করে খেলায়ও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

১৯৯০ সালে ইতালির ক্লাব লাৎসিওয়ের যুব দলে খেলার মধ্য দিয়ে পেশাদার ফুটবলে যাত্রা শুরু মাতেরাজ্জির। এরপর একে একে মেসিনা পেলোরো; ইতালির নিম্নস্তরের ক্লাব তোর দি কুইন্তো, মারসালা, ত্রাপানিতে খেলেন তিনি। কিন্তু গড়পড়তা পারফরম্যান্সের কারণে তখনও লাইমলাইটে আসতে পারেননি মাতেরাজ্জি।

১৯৯৫ সালে সিরি ‘বি’ এর ক্লাব পেরুগিয়ায় নাম লেখালেও তিনি পরের দুই মৌসুম সিরি ‘সি’-র কার্পি ক্লাবের হয়ে ধারে খেলেন। তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরে মূলত ১৯৯৮ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব এভারটনে লোনে খেলতে গিয়ে।

১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে তিনি ক্লাবটির হয়ে ২৭ ম্যাচ খেলেন। এসময়ে হার্ড ট্যাকলিংয়ের কারণে তিনবার সেন্ট অফ হন তিনি! ভাসমান বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করায় প্রিমিয়ার লিগে মিডলসবোরো এবং লিগ কাপে হাডার্সফিল্ড টাউনের বিপক্ষে দুবার লক্ষ্যভেদও করেন তিনি!

মাতেরাজ্জির পারফরম্যান্সের এই ধারাবাহিকতা দেখে পেরুগিয়া ঘরের ছেলেকে ঘরে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিদান দেন এই সেন্টার ব্যাকও। ২০০০-০১ মৌসুমে রক্ষণে দেয়াল গড়ে তোলার পাশাপাশি, একজন ডিফেন্ডার হিসেবে সিরি ‘এ’-তে রেকর্ড সর্বোচ্চ ১২ গোল করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান তিনি! এই নজরকাড়া পারফরম্যান্সে তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে বিখ্যাত ক্লাব ইন্টার মিলান। ২০০১-০২ মৌসুমে ১০ মিলিয়ন ইউরোতে ক্লাবটিতে পাড়ি জমান তিনি।

ইন্টারের জার্সিতে সতীর্থ ইভান কর্দোভার সঙ্গে রক্ষণভাগে দারুণ এক জুটি গড়ে তোলেন মাতেরাজ্জি। ২০০৬-০৭ মৌসুমে লিগে ডিফেন্ডারদের মধ্যে সর্বোচ ১০ গোল করে তিনি পান “সিরি ‘আ’ ডিফেন্ডার অব দ্য ইয়ার”-এর স্বীকৃতি। একইবছরে সান সিরোতে হয় লিগ শিরোপা জয়ের উৎসব।

তবে ক্লাব ক্যারিয়ারে মাতেরাজ্জি শিখরে পৌঁছান মূলত ২০১০ সালে। কিংবদন্তি কোচ হোসে মরিনহোর অধীনে সেবার তাঁর সব নিখুঁত ট্যাকল, কার্যকর ইন্টারসেপশান আর ক্লিয়ারেন্সের কারিকুরিতে ইন্টার মিলান সিরি ‘আ’, কোপা ইতালিয়া এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপার ট্রেবল জেতে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তাঁর ক্যারিয়ারের মাহেন্দ্রক্ষণ সেই ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। ম্যাচটিতে ফ্রান্স শুরুতে লিড নিলেও তাঁর দুর্দান্ত হেডার থেকেই আজ্জুরিরা খেলায় ফেরে। পরে অতিরিক্ত সময়ের ঢুঁসকাণ্ড ছাপিয়ে টাইব্রেকারের কঠিন স্নায়ুচাপের সময় তিনি গোল করে দলকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন। আসরটিতে ইতালির যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতাও ছিলেন এই ডিফেন্ডার।

মাতেরাজ্জির জয়রথ কেবল ইউরোপেই থেমে থাকেনি। ইন্টার পাঠ চুকানোর তিন বছর পর উপমহাদেশেও পা রাখেন এই তারকা। ভারতের চেন্নাই এফসিতে প্রথম মৌসুমে খেলোয়াড় হিসেবে সেভাবে আলো ছড়াতে না পারলেও, কোচ হিসেবে ২০১৫ সালে দলটিকে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) শিরোপা জয়ের স্বাদ এনে দেন এই ইতালিয়ান সেন্টার ব্যাক। তবে ২০১৬ সালে দলের সন্তোষজনক পারফরম্যান্স না থাকায় তাঁর সঙ্গে আর চুক্তি বাড়ায়নি চেন্নাই।

মাঠে মাতেরাজ্জির ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ ফুটবল প্রতিপক্ষের জন্য সবসময়ই ছিল আতঙ্কের বিষয়। ক্যারিয়ারজুড়ে তাঁর ৬০টি হলুদ কার্ড এবং সাতটি লাল কার্ড পাওয়ার পরিসংখ্যান সেটিরই প্রমাণ। তাই জিদানের সাথে ২০০৬ সালের সেই তিক্ততা ছাপিয়ে আলেসান্দ্রো নেস্তা, আন্দ্রে পিরলো, টট্টি কিংবা ফিলিপো ইনজাঘিদের মতো তিনিও ইতালির সোনালী প্রজন্মের ফুটবলারদের এক অবিচ্ছেদ্য আইকন। ইতালিয়ান ফুটবলে তাঁর নাম চিরভাস্বরই হয়ে থাকবে!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link