একটা সময় ম্যাচটা ছিল পুরোপুরি ভারতের নিয়ন্ত্রণে। ৫০৩ রানে ইনিংস ঘোষণা, এরপর শ্রীলঙ্কাকে ২৯০ রানে অলআউট করে ২১৩ রানের লিড, সব হিসাবই বলছিল, জয় সময়ের অপেক্ষা। এমনকি ফলো-অন করিয়ে শ্রীলঙ্কাকে দ্বিতীয়বার ব্যাটিংয়েও পাঠিয়েছিল ভারত। কিন্তু ক্রিকেটের গল্প যে স্কোরবোর্ডের হিসাব মেনে চলে না, তার প্রমাণ দিলেন সোনাল দিনুশা। তাঁর অতিমানবীয় প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত জয় নয়, ড্র মেনেই মাঠ ছাড়তে হলো ভারতকে।
ফলো-অনের পর শ্রীলঙ্কার সামনে তখন একটাই লক্ষ্য, ম্যাচটা বাঁচানো। একের পর এক উইকেট হারিয়ে যখন দলটা বিপদে, তখন ক্রিজে দাঁড়িয়ে গেলেন ২৫ বছর বয়সী এই বাঁহাতি অলরাউন্ডার। ভারতীয় বোলারদের সামনে বুক চিতিয়ে লড়লেন, সময় কাটালেন, সঙ্গীদের নিয়ে গড়লেন গুরুত্বপূর্ণ জুটি। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকল ম্যাচের চিত্র। ভারতের নিশ্চিত মনে হওয়া জয় চলে গেল অনিশ্চয়তার দিকে।
শুধু রান করাই নয়, দিনুশার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় মূল্য ছিল সময়। প্রতিটি বল যেন ভারতের জয় থেকে আরও একটি মুহূর্ত কেড়ে নিচ্ছিল। শ্রীলঙ্কার লিড বাড়তে থাকল, আর কমতে থাকল ভারতের হাতে থাকা সময়। শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা অলআউট হওয়ার আগেই দিনের আলো ফুরিয়ে আসে। ভারত আর প্রয়োজনীয় রান তাড়া করার সুযোগই পায়নি। ফলাফল, ড্র। আর এই ড্রয়ের সবচেয়ে বড় নায়ক হয়ে থাকলেন সোনাল দিনুশা।

এক কথায় বললে, দিনুশা একাই লড়াই করেছেন ভারতের সঙ্গে। প্রথম টেস্টে ফিরে গেলে সেখানেও গল্পটা অভিন্ন। ১০০ এবং ৮৪ রানের ইনিংস আসে ব্যাট থেকে। এমন অসামান্য পারফরম্যান্সের পরও অবশ্য শ্রীলঙ্কাকে পরাজয় বরণ করে নিতে হয়।
দ্বিতীয় টেস্টে আরও একবার ভারতীয় বোলারদের সামনে আরও ভয়াবহ রূপে হাজির হন দিনুশা। দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি, ১০৩ এবং ১৩৩। ৮০-এর নিচে কোনো রানই আসেনি তাঁর ব্যাট থেকে। এমন পারফরম্যান্সকে নিশ্চয় কোনো ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।
তবে দিনুশার এই গল্প আজকের নয়, শ্রীলঙ্কার স্কুল ক্রিকেটে। ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া দিনুশা পড়াশোনা করেছেন কলম্বোর মহানামা কলেজে। সেই স্কুল থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পাওয়া প্রথম ক্রিকেটার তিনি। অর্থাৎ দিনুশার টেস্ট ক্যাপ শুধু তাঁর নিজের অর্জন নয়, একটি স্কুলের দীর্ঘ অপেক্ষারও অবসান।

শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে স্কুল ক্রিকেটের গুরুত্ব নতুন কিছু নয়। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, লাসিথ মালিঙ্গা কিংবা সদ্য সাদা পোশাক তুলে রাখা অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস, দেশটির ক্রিকেটের বহু তারকার শিকড়ই ছড়িয়ে আছে স্কুল ক্রিকেটে। সাধারণ লঙ্কান মানুষের কাছেও স্কুল ক্রিকেটের আবেদন তাই আলাদা। আর সেই ঐতিহ্যের নতুন প্রতিনিধি সোনাল দিনুশা।
ভারতের বিপক্ষে এই ড্র হয়তো দিনুশার ক্যারিয়ারের বড় বাঁকবদল। ফলো-অন করেও একটি দল ম্যাচ বাঁচাতে পারে, এই বিশ্বাসটা এনে দিলেন দিনুশা।ভারতকে জয়বঞ্চিত করলেন। আরেকবার প্রমাণ হলো, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ খুঁজতে হলে তাকাতে হবে তাদের স্কুল ক্রিকেটের দিকেই। সেখান থেকেই হয়তো আবার জন্ম নিচ্ছে নতুন সাঙ্গাকারা, নতুন জয়াবর্ধনে, নতুন ম্যাথিউস কিংবা সোনাল দিনুশার মতো কেউ।










