গত বছরের আইপিএল শেষে যখন বৈভব সুরিয়াভানশি মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন অনেকের মনেই ছিল সংশয়। ক্রিকেটবোদ্ধাদের একটা বড় অংশ ভেবেছিলেন, কিশোর এই বিস্ময় হয়তো ধুমকেতুর মতো আগমনের পর এক ঝলক দেখিয়েই হারিয়ে যাবেন। প্রতিপক্ষ বোলাররা তাকে চিনে ফেলবে, তাঁর ব্যাটিংয়ের দুর্বলতাগুলো ব্যবচ্ছেদ করে তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দেবে। কিন্তু, ২০২৬ সালের আইপিএল দেখাচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তব। বৈভব হারাননি, বরং, অভিজ্ঞতার প্রলেপে তিনি এখন আরও বেশি ধারালো, আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য।
রাহুল দ্রাবিড় তাঁকে সাবধান করে বলেছিলেন, “আগামী বছরটা হবে তোমার জন্য আসল পরীক্ষা, কারণ, বোলাররা ততদিনে তোমাকে চিনে ফেলবে।” এই সতর্কবার্তা বৈভবের জন্য কোনো শঙ্কা নয়, বরং, হয়ে উঠেছিল এক অদম্য জেদ। সেই জেদ থেকেই এবারের আসরে তিনি ইতিমধ্যেই উপহার দিয়েছেন এক বিধ্বংসী সেঞ্চুরি ও দুটি ফিফটি। ৪০০-র বেশি রান নিয়ে তিনি এখন ২২ গজের এক আতঙ্কের নাম, যাকে থামানোর কোনো সহজ পথ বোলারদের জানা নেই।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে রাজস্থান রয়্যালসের সেই চিরচেনা কঠোর পরিশ্রমের রসায়ন। যশস্বী জয়সওয়াল, সাঞ্জু স্যামসন কিংবা রিয়ান পরাগদেরও এই পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। মেন্টর জুবিন ভারুচা এই নিয়ে উইজডেনকে বলেন, “সবাই ভবিষ্যৎবাণী করেছিল যে ওর দ্বিতীয় মৌসুমটা ভালো যাবে না। আর এটাই আমাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা ছিল যে কীভাবে ওকে তৈরি করা যায়।” বৈভব যেন এক আশ্চর্য জাদুকর, যার স্মৃতিতে প্রতিটি বলের খুঁটিনাটি গেঁথে থাকে। তার বুদ্ধিমত্তা আর প্রস্তুতির মিশেল তাকে সমসাময়িকদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রেখেছে।

বৈভবের ব্যাটিংয়ে এই আমূল পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের ছোঁয়া। আগে তার ব্যাটের সুইং স্পিড ছিল ঘণ্টায় ৯০-৯৫ কিলোমিটার। কিন্তু রয়্যালসের বিশেষ প্রশিক্ষণে তা এখন পৌঁছে গেছে ১১০-১১৫ কিলোমিটারে। ভারী ব্যাটে অনুশীলন আর মাঠের প্রতিটি বলকে সীমানা ছাড়া করার মানসিকতাই তাকে আজ এই উচ্চতায় বসিয়েছে।
এক সময় বৈভব ছিলেন মূলত অফ-সাইড নির্ভর ব্যাটসম্যান। বোলাররা হয়তো ভেবেছিলেন তাঁকে লেগ-সাইডে আটকে রাখা যাবে। কিন্তু, রাজস্থান রয়্যালস এই সীমাবদ্ধতাকেও শক্তিতে রূপান্তর করেছে। যদিও মিডউইকেট বা স্কয়ার লেগে বৈভবের কাজ করার অনেক জায়গা আছে, তবে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। নিজের ব্যাটিংকে নিখুঁত করতে বৈভব এতটাই নিবেদিত ছিলেন যে, দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষাও বিসর্জন দিয়েছেন অনুশীলনের নেশায়।
যশস্বী জয়সওয়াল, ধ্রুব জুরেল কিংবা সাঞ্জু স্যামসনরা যে কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজ তারকা হয়েছেন, বৈভবকেও সেই একই অগ্নিপরীক্ষায় পড়তে হয়েছে। হাজার হাজার বল খেলা আর কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে তাঁর এই ইস্পাতকঠিন ব্যাটিং ভিত্তি। ভারুচার মুখেও সেই কথা যেন ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “আমরা তাঁকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস লক্ষ্য করে গেছি। দেখেছি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ। এই কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে বলেই সে এমন।”

আজ যখন বৈভব সুরিয়াভানশি উইকেটে এসে দাঁড়ান, তখন কেবল একজন তরুণ ক্রিকেটারকে দেখা যায় না; দেখা যায় এক অপরাজেয় মানসিকতাকে। দ্রাবিড়ের সেই ‘আসল পরীক্ষা’য় তিনি কেবল উত্তীর্ণই হননি, বরং লেটার মার্কস নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের বিস্ময় হয়ে টিকে আছেন। ২০২৬-এর আইপিএল কেবল বৈভবের রানের সাক্ষী নয়, এটি এক নক্ষত্রের মহাকাশ জয়ের গল্প।










