ধুলোবালি থেকে জন্ম নিল এক নতুন জার্মানি

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়, বরং একটি জাতির পুনর্জন্মের দলিল হয়ে থাকে।

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা কেবল একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়, বরং একটি জাতির পুনর্জন্মের দলিল হয়ে থাকে। ১৯৫৪ সালের ৪ জুলাই, সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরের ওয়াঙ্কডর্ফ স্টেডিয়ামে যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের পাতায় খোদাই করা আছে এক ‘অলৌকিক’ ঘটনা হিসেবে।

​সে সময় হাঙ্গেরি ছিল বিশ্বের অপরাজেয় শক্তি। পুসকাস, ককসিসদের সেই ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ দল টানা ৩২ ম্যাচ অপরাজিত থেকে ফাইনালে এসেছিল। গ্রুপ পর্বে এই হাঙ্গেরিই পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে বিধ্বস্ত করেছিল।

বৃষ্টির ভেজা দিনে ফাইনাল যখন শুরু হলো, মাত্র আট মিনিটের মাথায় হাঙ্গেরি ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। গ্যালারিতে থাকা সবাই তখন নিশ্চিত – ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যবধানে হারতে যাচ্ছে জার্মানি।

কিন্তু প্রকৃতির খেলায় হয়তো অন্য কিছু লেখা ছিল। মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে মাঠ কর্দমাক্ত হয়ে যায়, যাকে জার্মানরা আদর করে বলত ‘ফ্রিটজ ওয়াল্টার ওয়েদার’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ানো বিধ্বস্ত জার্মানরা সেদিন হার মানতে রাজি ছিল না। অবিশ্বাস্যভাবে দশ মিনিটের মাথায় ম্যাক্স মরলক এক গোল শোধ করেন এবং মিনিট ছয়েক পর হেলমুট রান সমতা ফেরান।

​পুরো বিশ্ব তখন রুদ্ধশ্বাসে দেখছিল – একদল সাধারণ ফুটবলার কীভাবে ফুটবল বিধাতাদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে। ম্যাচের ৮৪ মিনিটে হেলমুট রান যখন বক্সের বাইরে থেকে এক বুলেট গতির শটে বল জালে জড়ালেন, তখন রেডিও ধারাভাষ্যকার হার্বার্ট জিমারম্যানের কণ্ঠ আবেগপ্রবণ হয়ে চিৎকার করে উঠছিল।

রেফারির শেষ বাঁশির পর পুরো জার্মানি যেন এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার থেকে জেগে উঠেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত, বিভক্ত এবং আত্মমর্যাদা হারানো একটি জাতির কাছে এই জয় ছিল বেঁচে থাকার নতুন রসদ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, আধুনিক জার্মানির প্রকৃত জন্ম হয়েছিল ওই দিন বার্নের সেই ভেজা মাঠেই।

​সেই জয় প্রমাণ করেছিল, পরিসংখ্যানে পিছিয়ে থেকেও হৃদয়ের জোরে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। হাঙ্গেরির সেই সোনালি প্রজন্মের চোখের জল আর জার্মানির বাঁধভাঙা উল্লাস আজও ফুটবল রোমান্টিকদের কাছে এক অমলিন স্মৃতি। বার্নের সেই বিকেলটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে – ফুটবল মাঠে রূপকথা কেবল কাগজে-কলমে থাকে না, তা মাঝেমধ্যে মাটির ঘাস চিরে বাস্তবেও ধরা দেয়।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link