রোনালদোর মিসিং পাজল

এবারের বিশ্বকাপ রোনালদোর জন্য একটু বিশেষই বটে। এখানেই যে অন্তিম অগ্নিপরীক্ষাটা দিতে হবে তাঁকে। কোটি কোটি চোখ, ক্যামেরার লেন্স একদিকে স্থির হয়েছে। সবার যেন একটাই আর্জি, শূন্য হৃদয়টা ভরিয়ে তোলো চ্যাম্প।

ব্যালন ডিঅর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, সঙ্গে আরও কতশত অর্জনের দীপ্তিময় মুকুট। নামের পাশে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রাজসিংহাসন। এত কীর্তি, এত গৌরব, এত অমরত্ব যার পদতলে নতজানু, তাঁর ক্যারিয়ার কি কখনো অপূর্ণ হতে পারে? অথচ এক মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়ে এসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর গল্পটা যেন থেমে আছে এক সোনালি ট্রফির অপেক্ষায়। বিশ্বকাপ নামক সেই অদেখা স্বপ্নটাই আজও তাঁকে তাড়া করে ফেরে। এবার বিদায়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা এই অতিমানবের শেষ লড়াই।

ম্যানচেস্টারের কুয়াশা ভেজা সন্ধ্যা থেকে মাদ্রিদের রাজকীয় শহর, তুরিনের রক্ষণাত্মক দুর্গ পেরিয়ে আরবের মরুভূমি, ফুটবলের প্রতিটি ভূখণ্ডেই নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন রোনালদো। ইউরো আর ন্যাশনস লিগ জিতে পর্তুগালকে এনে দিয়েছেন ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক গৌরব। ক্লাব ফুটবলের আকাশে যত নক্ষত্র জ্বালানো সম্ভব, তার প্রায় সবই জ্বালিয়ে ফেলেছেন তিনি। তবু ফুটবল বিধাতা যেন তাঁর ভাগ্যের পাতায় এখনো লিখে রাখেননি বিশ্বজয়ের শেষ হাসিটা।

২০০৬ সালে স্বপ্নভরা এক তরুণ বিশ্বকাপের মঞ্চে যে যাত্রা শুরু করেছিল, দুই দশক পর তা এসে থেমেছে আমেরিকা, কানাডা আর মেক্সিকোর সীমানায়। সময়ের কাঁটা আজ আর তাঁর পক্ষে গান গায় না। বয়স শরীরের কিছু গতি কেড়ে নিয়েছে, হয়তো নেই সেই চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতা। কিন্তু চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা ক্ষুধাটা? বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা জেদটা? সেগুলো এখনো আগ্নেয়গিরির জীবন্ত লাভা।

তাই এবারের বিশ্বকাপ রোনালদোর জন্য একটু বিশেষই বটে। এখানেই যে অন্তিম অগ্নিপরীক্ষাটা দিতে হবে তাঁকে। কোটি কোটি চোখ, ক্যামেরার লেন্স একদিকে স্থির হয়েছে। সবার যেন একটাই আর্জি, শূন্য হৃদয়টা ভরিয়ে তোলো চ্যাম্প।

সময় অনেক গল্পকেই অসমাপ্ত রেখে দেয়। অনেক কিংবদন্তির শেষটা হয় অপূর্ণতায় ঢাকা। কিন্তু ফুটবলবিশ্ব চায় রোনালদোর গল্পটা অন্যরকম হোক। বিদায়ের আলোছায়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর হাতে যেন একবার অন্তত ওঠে সেই সোনালি ট্রফি। শেষ বাঁশি বাজার আগে, শেষ সূর্য ডোবার আগে, আরেকবার যেন জ্বলে ওঠেন তিনি। আরেকবার যেন পৃথিবী দেখে, কেন তিনি শুধুই একজন ফুটবলার নন, একটা যুগের নাম।

বিশ্বকাপ না জিতলেও ইতিহাসের পাতায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে। কিন্তু এই বিশ্বকাপটাই হতে পারে তাঁর মুকুটের শেষ কোহিনূর, শেষ অপূর্ণতার পূর্ণতা। মাদেইরার ছোট্ট এক দ্বীপ থেকে যে ছেলেটার যাত্রা শুরু হয়েছিল গোল এক বলের পেছনে ছুটে, সেই যাত্রার শেষটা এবার রূপকথা হয়ে ওঠে কিনা, তা বলে দেবে সময়।

লেখক পরিচিতি

বেঁচে আছি না পড়া বইগুলো পড়ব বলে

Share via
Copy link