ফুটবল বিশ্বকাপের মৌসুম এলেই ভারতীয় উপমহাদেশে একটি গল্প নতুন করে ডালপালা মেলে। ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে খেলার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও ভারত নাকি শুধু খালি পায়ে খেলার জেদ ধরে রাখায় অংশ নিতে পারেনি! দশকের পর দশক ধরে এই একটি মিথ বা গুজবকে আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করে আসছি।
১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ভারতের ফুটবলাররা বুট ছাড়াই, কেবল পায়ে ব্যান্ডেজ বা মোজা জড়িয়ে মাঠে নেমেছিলেন। সেই ম্যাচে শক্তিশালী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই করে ২-১ ব্যবধানে হেরে গিয়েও বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়েছিল ভারত। তখনকার অধিনায়ক তালিমেরেন আও রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আমরা ভারতে খেলি ফুটবল, আর আপনারা খেলেন বুটবল!’
এই গল্প থেকেই মূলত ছড়ায় যে, ফিফা জুতো পরা বাধ্যতামূলক করায় ভারত ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ বয়কট করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১৯৫৩ সালের আগে ফিফা বুট পরা নিয়ে কোনো কড়া নিয়ম তৈরিই করেনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক যুগ পর ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে বসেছিল বিশ্বকাপের আসর। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ ও দূরত্বের কারণে তখন অনেক দেশই নাম প্রত্যাহার করে নিচ্ছিল। এশিয়া অঞ্চল থেকে ভারতের বাকি তিন প্রতিদ্বন্দ্বী শুরুতেই নাম প্রত্যাহার করে ফেলে। তাই কোনো ম্যাচ না খেলেই ভারত সরাসরি বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার টিকিট পেয়ে যায়।
তৎকালীন ভারতীয় ফুটবল কর্তাদের কাছে ‘বিশ্বকাপ’ ধারণাটি বেশ নতুন ও আবছা ছিল। তাদের পুরো মনোযোগ ছিল অলিম্পিক ও ১৯৫১ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমসের ওপর।
এছাড়াও তৎকালীন সময়ে ভারতের ঘরোয়া ফুটবলে ম্যাচ হতো ৭০ মিনিটের। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ম ছিল ৯০ মিনিটের। ভারতীয় ফুটবলারদের পুরো ৯০ মিনিট বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো স্ট্যামিনা বা ফিটনেস আছে কি না, তা নিয়ে কর্তাদের মনে তীব্র সংশয় ছিল। তাই শেষ পর্যন্ত না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ফেডারেশন।

ভারত ম্যাচ না খেলায় সেই বিশ্বকাপে তাদের গ্রুপে থাকা সুইডেন, ইতালি ও প্যারাগুয়ে একটি করে ম্যাচ কম খেলেছিল। ভারত যদি সেদিন ব্রাজিলে পা রাখত, তবে হয়তো আজ উপমহাদেশের ফুটবলের ইতিহাসটাই অন্যরকম হতো।
নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ভারত ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপের জন্য আবেদন করলেও, চার বছর আগের ‘অপমান’ ভুলে যায়নি ফিফা। তারা ভারতের সেই আবেদন সরাসরি নাকচ করে দেয়। আর সেই যে সুযোগ হাতছাড়া হলো, আজ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ভারতের আর ফেরা হয়নি।











