ফুটবলের সবুজ ক্যানভাসে তিনি কখনো বল পায়ে গোল করতে নামেননি, কিন্তু কোটি ফুটবলারের ভাগ্য নির্ধারণের এক অনন্য জাদুকর ছিলেন তিনি। বাঁশির শব্দ, লাল-হলুদ কার্ড আর জ্বলজ্বলে চোখের ইশারায় আস্ত একটা ম্যাচকে বশ করা এই মানুষটি আর কেউ নন, পিয়েরলুইজি কলিনা; যিনি রেফারি হয়েও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় এক আইকনে পরিণত হয়েছিলেন।
মাঠে যেখানে তারকা ফুটবলারদের দাপট আর অহংকার চলে, সেখানে কলিনা ছিলেন একচ্ছত্র অধিপতি। তাঁর সেই চুলহীন মসৃণ মাথা আর কোটর থেকে বেরিয়ে আসা তীক্ষ্ণ নীল চোখের চাউনি প্রতিপক্ষের মনে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ভীতি জন্ম দিত। বড় বড় তারকারাও তাঁর সিদ্ধান্তের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হতেন।
তবে কলিনার এই কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অসম্ভব সংবেদনশীল ও মানবিক মন। একবার ইতালিয়ান লিগে এক কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়কে বর্ণবাদী গালি দেওয়ায় ম্যাচ বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। ভুল স্বীকারে তাঁর কোনো দ্বিধা ছিল না; বিশটি ক্যামেরার ভিড়ে নিজের দুটি চোখের সীমাবদ্ধতাকে কলিনা সবসময় বিনম্র চিত্তে মেনে নিতেন।

২০০২ সালের বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল কলিনার ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। জার্মানি ও ব্রাজিলের মধ্যকার সেই চাপ দিয়ে ঘেরা ঐতিহাসিক মহাকাব্যিক ম্যাচটি তিনি পরিচালনা করেছিলেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। পাঁচবার বিশ্বের সেরা রেফারি নির্বাচিত হওয়া কলিনা ফুটবলকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক অনন্য ও শৈল্পিক উচ্চতায়।
১৯৮৪ সালে হুট করে ‘অ্যালোপেসিয়া’ রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ১৫ দিনে সব চুল হারিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এই শারীরিক পরিবর্তনকে তিনি নিজের শক্তিতে রূপান্তর করেন। মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন খাঁটি ইতালিয়ান স্টাইলের এক সুপুরুষ, যিনি বিশ্বজুড়ে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে জাপানের বিজ্ঞাপনেও মডেল হিসেবে কাজ করেছেন।
কলিনার সেই ভয়ংকর অথচ মায়াবী চোখের চাউনি আর মাঠের কঠোর শাসনের কথা স্মৃতিতে আসলেই দর্শক তখন রোমাঞ্চিত হতে বাধ্য। আজ যান্ত্রিক ফুটবলের যুগে অনেক রেফারি আসেন, কিন্তু কলিনার মতো কেউ আর আসেন না, যিনি মাঠে ফুটবলারদের চেয়েও বড় চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন। পিয়েরলুইজি কলিনার শূন্যতা ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে আজীবন থেকে যাবে।











