বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, নতুন ক্রিকেটার তৈরি হবে কখন? উত্তরটি যতটা সহজ, বাস্তবতা ততটাই জটিল। কারণ সুযোগ আসে, কিন্তু সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার হয় না। সম্প্রতি জিম্বাবুয়ের মতো দলের বিপক্ষে ঘোষিত ওয়ানডে দলটি আবারও সেই পুরোনো বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে হওয়া সত্ত্বেও মুস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদ, লিটন দাস কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারদের দিয়েই একাদশ সাজাতে হয়, তাহলে নতুনদের জন্য দরজা খুলবে কবে? একজন আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারের সামর্থ্য কি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রমাণ করতে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর যতটা ক্রিকেটীয়, তার চেয়ে বেশি পরিকল্পনার।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের অতীত দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও তথাকথিত ‘পঞ্চপান্ডব’-নির্ভর দল নামানো হয়েছিল। ফলাফল, কয়েকজন কিংবদন্তি ক্রিকেটার তৈরি হলেও তাদের বিকল্প গড়ে ওঠেনি। সেই শূন্যতার মূল্য এখনও দিচ্ছে বাংলাদেশ। নতুন নির্বাচক কমিটির কাছে তাই প্রত্যাশা ছিল, অন্তত এমন সিরিজে তারা সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু ঘোষিত দল দেখে মনে হয়েছে, পথ বদলালেও দর্শন বদলায়নি।

মুস্তাফিজ ও তাসকিনকে এই সিরিজে বিশ্রাম দেওয়া যেত অনায়াসে। সামনে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সূচি থাকায় তাদের শারীরিক ও মানসিক সতেজতা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গায় প্রিমিয়ার লিগে ধারাবাহিক পারফর্ম করা মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরীর মতো একজন পেসার সুযোগ পেতে পারতেন। ইংল্যান্ডে আয়ারল্যান্ড সিরিজে সুযোগ পাওয়ার পর তাকে আর বিবেচনায় না রাখা নির্বাচকদের পরিকল্পনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একইভাবে মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকেও পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ চাইলেই দেওয়া যেত। নতুনদের পরীক্ষার জন্য এর চেয়ে নিরাপদ মঞ্চ আর কী হতে পারে?
ব্যাটিং বিভাগেও একই প্রশ্ন উঠে আসছে। সাইফ হাসানের সাম্প্রতিক ফর্ম নিয়ে সংশয় রয়েছে। বাংলাদেশের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ডানহাতি ওপেনারের সংকটও নতুন নয়। অথচ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের একজন শাহাদাত হোসেন দিপু বিবেচনায় এলেন না। তরুণ মাহফিজুল ইসলাম রবিন কিংবা জাওয়াদ আবরারের মতো ক্রিকেটাররাও ভবিষ্যতের সম্পদ হতে পারেন।
অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় মঞ্চ জয় করার ইতিহাসও তো তরুণদের হাত ধরেই লেখা হয়েছে। সাকিব আল হাসান কিংবা তামিম ইকবালও ক্যারিয়ারের শুরুতেই নিজেদের জানান দিয়েছিলেন।

একইভাবে তানজিদ হাসান তামিমকে বিশ্রাম দিয়ে পারভেজ হোসেন ইমনকে সুযোগ দেওয়াও ভালো সিদ্ধান্ত হত। ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফর্ম করেও তার মতো ওপেনার আন্তর্জাতিক দলে জায়গা না পেলে পারফরম্যান্সের মূল্য কোথায়? এই প্রশ্ন থেকেই যায়। মিডল অর্ডারেও বিকল্প ভাবনার সুযোগ ছিল। লিটন দাসকে বিশ্রাম দিয়ে আফিফ হোসেনকে ফেরানো যেত। বাংলাদেশের চার থেকে আট নম্বর পর্যন্ত ব্যাটিং লাইনে বাঁহাতি ব্যাটারের অভাব দীর্ঘদিনের। আফিফ সেই ভারসাম্য আনতে পারতেন।
অনেকের দাবি, ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা নিশ্চিতে র্যাঙ্কিং পয়েন্ট অর্জনে ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। অথচ অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা ভারত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নয়, তুলনামূলক দুর্বল দলের বিপক্ষেই নতুনদের সুযোগ দেয়। কারণ তারা জানে, ভবিষ্যতের দল গড়ে ওঠে পরিকল্পিত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে, শুধুমাত্র জয়ের ধারাবাহিকতায় নয়।










