গ্রুপপর্বের গণ্ডি পেরিয়ে শুরু হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব। এ পর্বে প্রায়শই ৯০ মিনিটের ফুটবলীয় লড়াই কখনও কখনও গিয়ে ঠেকে মাত্র ১২ গজের টাইব্রেকার যুদ্ধে। বিশ্বকাপের অসংখ্য স্মরণীয় রাতের মতো এবারও তাই টাইব্রেকার হতে পারে শিরোপার দাবিদারদের ভাগ্য নির্ধারক। কিন্তু এই স্নায়ুচাপের পরীক্ষায় সাফল্য কি কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে?
গবেষণা বলছে, পরিসংখ্যান, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশলের সমন্বয়ই এখানে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। বিশ্ব ফুটবলের বিভিন্ন আসরের টাইব্রেকার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রথমে শট নেওয়া দল তুলনামূলক বেশি জয়ের স্বাদ পায়। কারণ শুরুতেই গোল করা প্রতিপক্ষের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক গবেষণা আরও বলছে, টস জেতাটাই আসল সুবিধা। টসে জয়ী দল পরিস্থিতি বুঝে আগে বা পরে শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা চাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

শুধু মানসিকতা নয়, শট নেওয়ার ধরনেও লুকিয়ে আছে সাফল্যের সূত্র। ইউরোপের শীর্ষ চার লিগে প্রায় ১,৭০০ পেনাল্টি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ছয় ধাপ বা তার বেশি রান-আপ নেওয়া খেলোয়াড়দের সাফল্যের হার তুলনামূলক বেশি। খুব ছোট রান-আপে সেই সুবিধা মেলেনি। তাই প্রস্তুতির ছন্দও হয়ে উঠতে পারে আত্মবিশ্বাসের ভাষা।
পেনাল্টি শুটআউটে শক্তি নাকি নিখুঁত প্লেসমেন্ট গুরুত্বপূর্ণ—এই বিতর্কও বেশ পুরোনো। গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত জোরে মারা শট বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, আবার খুব ধীরগতির শট গোলরক্ষকের হাতে আটকে যেতে পারে। মাঝামাঝি শক্তির শটগুলোই তাই নিখুঁত লক্ষ্যভেদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হয়ে থাকে।
শট কোথায় নেওয়া হবে, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি ফুটবলারদের জন্য। অনুসন্ধান বলছে, ওপরের কর্নারে মারা বল ঠেকানো কঠিন হলেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। একারণে অধিকাংশ ফুটবলার নিচের দিকে শট নেওয়াই বেশি পছন্দ করেন। আবার গোলরক্ষকেরা প্রায়ই শুটআউটের সময় ডানে বা বাঁয়ে ঝাঁপ দেন। সে ক্ষেত্রে গোলের মাঝামাঝি জায়গায় নেওয়া শটও হতে পারে সফল।

গোলরক্ষকের এই প্রবণতার পেছনে রয়েছে মূলত মনস্তত্ত্বের খেলা। গবেষকদের ভাষায়, তারা ‘অ্যাকশন বায়াস’-এ ভোগেন, যা স্থির দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে ঝাঁপ দেওয়াকেই নিরাপদ হিসেবে তুলে ধরে। এতেই মাঝ বরাবর নেওয়া শট অনেক সময় অপ্রত্যাশিত অ্যাডভান্টেজ এনে দেয়।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টাইব্রেকার শুধু স্নায়ুর লড়াই নয়। আধুনিক ফুটবলের এই শতাব্দীতে এটি প্রস্তুতি, গবেষণা ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের এক সমন্বিত পরীক্ষা। তাই ১২ গজের ক্ষুদ্র দূরত্বেই লুকিয়ে থাকে এক জাতির উল্লাস, অপরের দীর্ঘশ্বাস। নিহিত থাকে ফুটবল তথা বিশ্বকাপের সৌন্দর্য।










