সব বড় দলেরই এমন একজন ফুটবলার থাকেন, যিনি শুরু থেকে আলোচনার কেন্দ্রে না থাকলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। এই আর্জেন্টিনা দলে সেই নামটি নিঃসন্দেহে লাউতারো মার্টিনেজ।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। ৭২ মিনিটে রদ্রিগো ডি পল মাঠে নামার পর থেকেই ম্যাচের ছন্দ বদলাতে শুরু করে। মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় আর্জেন্টিনা, আক্রমণের গতি বেড়ে যায়, আর নতুন করে প্রাণ ফিরে পান লিওনেল মেসিও। একের পর এক আক্রমণে চাপে পড়তে থাকে ইংল্যান্ড।
তবে লাউতারো তখনও মাঠে নামেননি। ৮১ মিনিটে নিকোলাস ট্যাগলাফিকোর বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। চার মিনিট পরই আসে সমতার গোল। ৮৫ মিনিটে লিওনেল মেসির নিখুঁত পাস থেকে গোল করে ম্যাচে ১-১ সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। সেই গোলের পর ম্যাচের পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আর্জেন্টিনার হাতে।

অতিরিক্ত সময়েও আক্রমণ চালিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আবারও জাদু দেখান মেসি। বল কেড়ে নিয়ে দারুণ এক ক্রস বাড়ান বক্সে, আর সেখানে সবার ওপরে উঠে শক্তিশালী হেডে জাল কাঁপান লাউতারো মার্টিনেজ। আবারও ‘সুপার সাব’ হয়ে দলকে পৌঁছে দেন বিশ্বকাপের ফাইনালে।
ম্যাচ শেষে লাউতারোর মুখে শোনা যায় আরও অবিশ্বাস্য এক গল্প। তিনি জানান, জয়সূচক গোলটি যেন আগেই স্বপ্নে দেখে ফেলেছিলেন। এমনকি মাঠে নামার আগে আলেক্সিস ম্যাক এলিস্টারকেও বলে রেখেছিলেন, তিনি বদলি হিসেবে নেমে গোল করবেন এবং আর্জেন্টিনাকে জয় এনে দেবেন। শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্যভাবে সেটাই সত্যি হলো।
এটাই অবশ্য প্রথম নয়। এর আগে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও অতিরিক্ত সময়ে বদলি হিসেবে নেমে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলটি করেছিলেন লাউতারো। অর্থাৎ টানা দুই নকআউট ম্যাচে বেঞ্চ থেকে নেমে গোল করে দলকে জয় এনে দিয়েছেন তিনি। বড় মঞ্চে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে যে তার ওপর ভরসা করা যায়, সেটাই আবারও প্রমাণ করলেন এই স্ট্রাইকার।

লাউতারোর সঙ্গে আর্জেন্টিনার সাফল্যের সম্পর্কটা অবশ্য নতুন নয়। ২০২১ কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের অভিযানে তিনি করেছিলেন তিনটি গোল। বলিভিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্ব, ইকুয়েডরের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপেই গোল করেছিলেন তিনি। সেই কোপা থেকেই শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার নতুন সোনালি অধ্যায়।
এরপর থেকে বড় টুর্নামেন্টে লাউতারো গোল পেলেই আর্জেন্টিনার সাফল্যের সম্ভাবনাও যেন বেড়ে যায়। এই বিশ্বকাপেও শুরুটা ছিল তার জন্য ম্লান। সুযোগ পেলেও গোলের দেখা পাচ্ছিলেন না, সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি। কিন্তু দল যখন সবচেয়ে বেশি তাকে প্রয়োজন অনুভব করেছে, ঠিক তখনই জ্বলে উঠেছেন তিনি।
বড় খেলোয়াড়দের আসল পরিচয় মেলে বড় মঞ্চে। আর লাউতারো মার্টিনেজ আবারও দেখিয়ে দিলেন, নায়ক হওয়ার জন্য শুরু থেকেই আলোয় থাকতে হয় না। ইতিহাস লেখা যায় শেষ মুহূর্তেও। আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ‘সুপার সাব’ এখন লাউতারো মার্টিনেজ।












