স্প্রিন্ট ট্র্যাকে চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্রতা নিয়ে উদযাপন করতে করতেই ফিনিশিং লাইনের দিকে ছুটে যাচ্ছেন এক তরুণ, যাঁর ধারেকাছেও নেই অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী। হ্যাঁ, তিনি গতিদানব উসাইন বোল্ট!
আপনার হাতে সময় মাত্র সাড়ে নয় সেকেন্ড। এই সামান্য সময়ে আপনি কী করতে পারবেন? এক-দুবার চোখের পলক ফেলা বা হয়তো নি:শ্বাস নেওয়া ছাড়া? কিন্তু এই সাড়ে নয় সেকেন্ডেই পুরো পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য চরিত্র উসাইন বোল্টের।
অথচ অলিম্পিকের ইতিহাসে সেই অবিশ্বাস্য মহাকাব্য শুরুর আগে বিশ্বমঞ্চে তিনি ছিলেন এক আনকোরা তরুণ। ২০০২ সালে বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে কিংস্টনে ২০০ মিটারের স্প্রিন্টে স্বর্ণ জিতে প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৮৬ সালের ২১ আগস্ট জ্যামাইকার ট্রেলাউনির শেরউড কনটেন্টে জন্মানো এই দৌঁড়বিদ।
তারপর ২০০৬ সালে গ্রিসের এথেন্সে আইএএএফ অ্যাথলেটিক্স বিশ্বকাপে ১৯.৯৬ সেকেন্ডে দৌঁড় শেষ করে দ্বিতীয় হন বোল্ট। দুবছরের ব্যবধানে তাঁর ক্যারিয়ারে আগমন ঘটে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের।

২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিক। বার্ডস নেস্টা স্টেডিয়ামে তখন এগারো হাজার অ্যাথলেটের বিশাল মিলনমেলা। ২১ বছরের তরুণ বোল্ট ট্র্যাকে নামলেন। ১০০ মিটার স্প্রিন্টের শেষ ২০ মিটার বাকি থাকতেই তিনি এদিক-ওদিক তাকাতে শুরু করলেন—তাঁর ধারেকাছেও নেই আর কোনো প্রতিযোগী! তাই নিজের বুক চাপড়ে উদযাপন করতে করতেই তিনি সমাপ্তিরেখা পার হলেন নির্ভার হয়ে। স্কোরবোর্ডে তখন ৯.৬৯ সেকেন্ডের বিশ্বরেকর্ডের ঝলকানি!
সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কিম কলিন্স বিস্মিত হয়ে বলেই ফেললেন, ‘এ কি কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব!’ ২০০ মিটার স্প্রিন্টেও স্বর্ণ জিতে নেন বোল্ট! ব্যস! আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে!
এরপর ২০১২ ও ২০১৬ অলিম্পিকেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান এই কিংবদন্তি। লন্ডন অলিম্পিকেও ১০০ ও ২০০ মিটারের একক দৌঁড়ে দেশকে সোনা জেতান। একইসঙ্গে, ৪০০ মিটারের ৪×১০০ মিটার রিলে দৌঁড়ে স্বর্ণ জিতলেও তাঁর এক সতীর্থের ডোপিং কেলেঙ্কারিতে পদক হারান এই জ্যামাইকান!
তবে. রিও ডি জেনেইরোতে আর রোখা যায়নি তাঁকে। ১০০ ও ২০০ মিটারের সঙ্গে সঙ্গে ৪×১০০ মিটার রিলেতেও প্রথম স্থান অধিকারের কীর্তি গড়েন তিনি। টানা তিন অলিম্পিকে এমন সাফল্যের নজির নেই আর কারোরই।

২০০৯ সালের বার্লিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি মানুষের সামর্থ্যের শেষ সীমানার সংজ্ঞাকেই যেন বদলে দেন। ১০০ মিটারের দৌঁড় ৯.৫৮ সেকেন্ডে এবং ২০০ মিটারে ১৯.১৯ সেকেন্ডে শেষ করে এমন এক ইতিহাস গড়েন, যা ভাঙার কথা আজ পর্যন্ত কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। সেদিন বার্লিনের মেয়র ক্লস ভভেরিট মুগ্ধ হয়ে বলেই ফেলেন, ‘বার্লিনের দেয়াল ভাঙাও হয়তো এই ছেলের কাছে কোনো ব্যাপার নয়, যেভাবে সে দৌঁড়ায়!’
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও অনবদ্য ছিলেন এই জ্যামাইকান। রেকর্ড ১১টি সোনা জয় সেটিরই প্রমাণ। একারণেই আইএএএফ বিশ্ব বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ পুরস্কার, ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ পুরস্কার, বিবিসি ওভারসিজ স্পোর্টস পার্সোনালিটি অফ দ্য ইয়ার (তিনবার), এবং লরিয়াস বিশ্বসেরা ক্রীড়াবিদ পুরস্কারের (চারবার) মতো সম্মাননা পেয়েছেন বোল্ট। ২০১৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকাতেও ঠাঁই পান তিনি।
তবে বোল্ট কেবল একজন অ্যাথলেট ছিলেন না। ডোপিং আর দুর্নীতির নিকষ অন্ধকারে ডুবে যাওয়া অ্যাথলেটিক্সে তিনি ছিলেন এক অনির্বাণ আলোর শিখা। জাস্টিন গ্যাটলিন বা মারিয়ন জোনসের ডোপ কলঙ্কের মাঝে বোল্ট ফিরিয়ে আনেন হারিয়ে যাওয়া আস্থা। মাঠের বাইরে নিষ্কলুষ থেকেও যে ট্র্যাকে রাজত্ব করা যায়, বোল্ট ছিলেন তার জীবন্ত প্রমাণ। কোটি কোটি দর্শক জানত, মানুষটা কোনো নিষিদ্ধ ড্রাগ না নিয়েই নিজের খাঁটি সামর্থ্যে জিতছেন সব।
কিন্তু প্রকৃতি বড় বেখেয়ালি। ২০১৭ সালের ১২ আগস্ট, লন্ডনের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ক্যারিয়ারের শেষবারের মতো ট্র্যাকে নামেন এই সম্রাট। জ্যামাইকার হয়ে ৪×১০০ মিটার রিলের ব্যাটন যখন হাতে নিলেন, হঠাৎই বাম হ্যামস্ট্রিংয়ে তীব্র ব্যথা জেঁকে বসল। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন ট্র্যাকে। টুকরো টুকরো হয়ে যায় কোটি ভক্তের হৃদয়। পরে জাস্টিন গ্যাটলিনের কাছে শেষ একক ১০০ মিটারেও হেরে ব্রোঞ্জ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাঁকে।

শেষটা খুব একটা সুখকর না হলেও, অলিম্পাসের দেবতার আশীর্বাদে বোল্টের নাম অনুরণিত হবে দর্শকদের মনে! ট্র্যাকে হয়তো আর কখনো দেখা যাবে না তাঁর চেনা চিতাবাঘের মতো গতির গর্জন। কিন্তু যুগের পর যুগ বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের আকাশে জ্বলজ্বল করবে একটিই নাম – দ্য ফরেভার ফাস্টেস্ট উসাইন সেন্ট লিওঁ বোল্ট!










