কামব্যাক কিং নাজমুল হোসেন শান্ত!

শৈশবে যখন হাতে ব্যাট তুলে নিয়েছিলেন, তখন হয়তো নিজেও জানতেন না—একদিন তাকে ঘিরেই লেখা হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে নাটকীয় পুনর্জন্মের গল্প। আজ ২৫ আগস্ট, নাজমুল হোসেন শান্তর জন্মদিন। কিন্তু এই দিনটা শুধু একটা তারিখ নয়, এটা এক যোদ্ধার বেঁচে থাকার প্রমাণ—এমন এক যোদ্ধা, যাকে ইতিহাস চিনবে "দ্য কামব্যাক কিং" নামে।

শৈশবে যখন হাতে ব্যাট তুলে নিয়েছিলেন, তখন হয়তো নিজেও জানতেন না—একদিন তাকে ঘিরেই লেখা হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে নাটকীয় পুনর্জন্মের গল্প। আজ ২৫ আগস্ট, নাজমুল হোসেন শান্তর জন্মদিন। কিন্তু এই দিনটা শুধু একটা তারিখ নয়, এটা এক যোদ্ধার বেঁচে থাকার প্রমাণ—এমন এক যোদ্ধা, যাকে ইতিহাস চিনবে “দ্য কামব্যাক কিং” নামে।

সময়টা ছিল নিষ্ঠুর। মাঠে নামলেই সস্তা শটে আউট, আর গ্যালারি থেকে সোশ্যাল মিডিয়া—সবখানে একটাই আওয়াজ, “লর্ড শান্ত”, “খেলা পারে না”। ২০১৭ থেকে ২০২২, পাঁচটা বছর তিনি ভুগেছেন চরম অফ-ফর্মে। টেস্টে ব্যাটিং গড় ছিল মোটে ২৪.৩০, আর ওয়ানডেতে অবস্থা ছিল আরও করুণ—১৫ ম্যাচে মাত্র ২১০ রান, গড় ঠেকেছিল ১৪.০০-এ, একটাও হাফ-সেঞ্চুরি ছাড়াই। প্রতিটা ইনিংস যেন এক একটা বিচারের কাঠগড়া, আর জনতার রায় ছিল নির্মম। কেউ কেউ তাকে ডেকেছিল দলের “সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা”।

কিন্তু ট্রলের সেই তুফানের ভেতরেই তৈরি হচ্ছিল এক অন্য শান্ত—যে রাজপুত্র নিজের রাজ্য হারিয়ে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যার আদর্শ সাকিব আল হাসান—বাংলাদেশ থেকে উঠে বিশ্বসেরা হওয়ার সেই গল্পটাই তাকে শিখিয়েছিল হাল না ছাড়তে। ২০২২ বিশ্বকাপ থেকে বদলাতে শুরু করলেন, আর ২০২৩-২৬ সময়ে টেস্ট গড় গিয়ে দাঁড়াল ৪৩.৭২-এ। যে ছেলেকে নিয়ে হাসাহাসি হতো, সে-ই আজ বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক, ক্রিজে থাকা মানেই দর্শকের বুকে জমা হয় ভরসা। এটাই তো কামব্যাক কিং-এর আসল পরিচয়—যিনি পতনের গভীরতম বিন্দু থেকেই খুঁজে নেন উত্থানের রসদ।

অধিনায়কত্ব তাকে ভাঙেনি, বরং শাণিত করেছে। নেতৃত্বের আগে যেখানে গড় ছিল ২৯.৮৩, দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর সেটাই ৩৯.৪২—পাঁচটা সেঞ্চুরি, একবারও শূন্যতে আউট নয়। কুড়ি টেস্টে নয়টি জয় নিয়ে ছাড়িয়ে গেছেন মুশফিকুর রহিমের পুরনো রেকর্ড। তবে সংখ্যার চেয়েও বড় তার মানসিকতা—দেশি মাটিতে গড়া এক অস্ট্রেলিয়ান মাইন্ডসেট, যেখানে হার মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি নেই, ড্র করে বেঁচে যাওয়ার চিন্তাও নেই। প্রতিটা সেশনকে তিনি দেখেন যুদ্ধ জয়ের একেকটা সুযোগ হিসেবে, প্রতিপক্ষকে চেপে ধরার একেকটা মঞ্চ হিসেবে। বাইশ গজে যখন চাপ বাড়ে, তখনই যেন সবচেয়ে ধারালো হয়ে ওঠে শান্তর মস্তিষ্ক—আগ্রাসী ফিল্ড সাজানো, বোলারদের উইকেট নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া, আর প্রতিপক্ষকে নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত না দেওয়া—এই মানসিকতাই তাকে আলাদা করেছে তার পূর্বসূরিদের থেকে।

ড্রেসিংরুমে তিনি শান্ত স্বরে আগুন জ্বালান, মাঠে সেই আগুনই রূপ নেয় নিখুঁত পরিকল্পনায়। যে ছেলেটাকে একদিন গ্যালারি থেকে দুয়ো শুনতে হতো, আজ তার নামেই আস্থা রাখে গোটা জাতি—ব্যাট হাতে যেই ফরম্যাটেই নামুন না কেন।

যে “লর্ড” খেতাব একদিন ব্যঙ্গ হয়ে বিঁধত তার গায়ে, আজ সেই কাঁটাই যেন হয়ে উঠেছে মুকুট। ট্রলের আগুনে পুড়ে যিনি খাঁটি সোনা হয়ে বেরিয়ে এসেছেন, ইতিহাস তাকে নতুন নামেই মনে রাখবে—দ্য কামব্যাক কিং। নাজমুল হোসেন শান্তর এই যাত্রা প্রমাণ করে, সমালোচনা কাউকে শেষ করে দেয় না, বরং সময় হলে সেটাই হয়ে ওঠে উত্থানের সবচেয়ে বড় সিঁড়ি।

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link