লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারটা ঠিক যেন এক ছোটগল্প। যার শেষে এসে নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায় – শেষ হইয়াও হইল না শেষ!
২০১৬ সালের ২৬ জুন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কোপা আমেরিকা সেন্টানারিওয়ের ফাইনালে চিলির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যায় মেসির আর্জেন্টিনা। লিওর কাছে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিসের যন্ত্রণার চেয়েও সেদিন অসহ্য হয়ে ওঠে তিন বছরে তিনটি ফাইনাল খেলে শিরোপা না ছুঁতে পারার আক্ষেপ!
তখনও ক্লাব পর্যায়ে বার্সেলোনার হয়ে আটটি লা লিগা, চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসির একমাত্র অর্জন ছিল আর্জেন্টিনা অনূর্ধ-২৩ দলের হয়ে ২০০৮ অলিম্পিকের স্বর্ণপদক।

২০১৬ সালে টানা তিন ফাইনাল হারের পর তাই সিনিয়র পর্যায়ে শিরোপাহীনতা নিয়ে সর্বত্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। এমনকি খোদ কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনাও সমালোচকদের সুরে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘মেসির নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য নেই!’
মানসিক অবসাদ আর হতাশায় টালমাটাল মেসি ২৯ বছর বয়সেই তাই ঘোষণা দিয়ে ফেলেন, ‘আমার জন্য জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ!’ কিন্তু বিশ্বসেরা ফুটবলারের এই বিদায় কেন মেনে নেবেন কোটি কোটি ভক্তরা? মেসির অবসরের ঘোষণায় নড়ে ওঠে গোটা ফুটবল বিশ্ব। সতীর্থরা তাঁকে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘যেও না মেসি’-র মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহারের বন্যা বয়ে যায়। বুয়েনস এইরেসের রাস্তায় তাঁর ভাস্কর্য গড়া হয়।
খোদ আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট মাউরিসিও মাক্রি তাঁকে ফোন করে সান্ত্বনা দেন, দেশের হয়ে খেলার অনুরোধ জানান। অবশেষে আর্জেন্টিনার নতুন কোচ এদগার্দো বাউজা সশরীরে বার্সেলোনায় গিয়ে মেসিকে সিদ্ধান্ত বদলাতে রাজি করান। আর এই একটি সিদ্ধান্ত ফুটবলের আধুনিক ইতিহাসকেই যেন বদলে দেয়।

তবে, অবসর ভেঙে ফেরার পরই সাফল্য জোটেনি মেসির কপালে। ২০১৮ বিশ্বকাপে আরেক দফা হৃদয় টুকরো হয় তাঁর। ফ্রান্সের কাছে আবারও রাউন্ড অব সিক্সটিনে হেরে বিদায় নেওয়ার পর অনেকেই ফের আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শিরোপা জেতার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেন।
কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানোর অন্য নামই তো মেসি! ৩৪ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো মেজর ট্রফি না পাওয়া মানুষটা পরবর্তী ছয় বছরে আলবিসেলেস্তেদের এনে দেন চারটি আন্তর্জাতিক শিরোপা।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০২২ ফিনালিসিমায় ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে শিরোপা জেতেন মেসি। একই বছরে নিজের ক্যারিয়ারের বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদও পান ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন রোজারিওতে জন্মানো এই কিংবদন্তি। মেসি ম্যাজিকে ২০২৪ সালে ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা শিরোপাও ধরে রাখে আর্জেন্টিনা।

এখানেই শেষ নয়! ২০২৬ সালে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও দ্যুতি ছড়ান লিওনেল মেসি। এবারের আসরে আট গোল করে তিনি বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কীর্তিও গড়েন! পাশাপাশি করেন চার অ্যাসিস্ট।
বয়সের সাথে সাথে অন্যান্যদের মতো কিছুটা গতি হারালেও নীল-সাদা জার্সিতে মেসি শেষদিন পর্যন্ত কার্যকারিতা নিয়ে খেলার চেষ্টা করেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে রানার্সআপ হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেও দেশের হয়ে তাঁর ২০৭ ম্যাচে রেকর্ড ১২৫টি গোলের পরিসংখ্যান সেটিরই প্রমাণ।
ফুটবলে বহু তারকা নানাভাবে প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে গেছেন, লিখছেন এবং হয়ত ভবিষ্যতেও লিখবেন! কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে ১০ বছর আগে অবসর ভেঙে ফিরে মেসি যে অমর উপাখ্যান রচনা করেছেন তা আজীবন ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিকাতর করে রাখতে বাধ্য, কারণ এটা হলো এমন গল্প—যা শেষ হয়েও কখনো হয় না শেষ!











