রূপকথার গল্পর কথাই ভাবুন না, রাজা হতে কে না চায়। সেই সুযোগ ক’জনই বা পান। সেই সুযোগটাই হাতে পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন লন্ডনের অখ্যাত এক ক্লাবের গোলরক্ষক। উগান্ডার তোরো রাজ্যের সিংহাসনে বসার প্রস্তাব পেয়েও না করে দিলেন ফুটবলার জর্জ ডেসমন্ড কামুরাসি।
অথচ এই মানুষটার জীবনের শুরুটা মোটেও রাজকীয় ছিল না। ১৪ বছর বয়সে মাকে হারান কামুরাসি। তারপর ভুল সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, রাগে ভুল সিদ্ধান্ত নেন, একসময় জেলেও যেতে হয় তাকে। নিজেই পরে বলেছেন, সেলে বসে বুঝেছিলেন যা কিছু হয়েছে সবটাই তার নিজের দোষে। সেখান থেকেই দায়িত্ব নেওয়া শুরু।
জেল থেকে বেরিয়ে ফুটবলে ঝাঁপিয়ে পড়েন কামুরাসি।তাঁর ভাষায়, ‘বেরিয়ে এলাম, ফুটবলে ঢুকে পড়লাম, নিজেকে উজাড় করে দিলাম।’ নাইকি একাডেমি তাকে স্কাউট করে। তিনি নিজেই জানান বার্সেলোনায়ও খেলার সুযোগ পান তিনি, যেখানে তাকে দেখেছিলেন পেপ গার্দিওলা। তবে পেশাদার ফুটবলে বড় কোনো নাম হয়ে উঠতে পারেননি। ইংল্যান্ডের নিচু সারির ফুটবলেই থিতু হন, অ্যাশফোর্ড ইউনাইটেড, হার্ন বে ঘুরে শেষমেশ এসই ডনসে।

দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের এই ক্লাবে তাকে সবাই চেনে ‘বিগ জি’ নামে। ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার গোলরক্ষক, ম্যাচের আগে সতীর্থদের গলা ফাটিয়ে উজ্জীবিত করেন, তরুণদের কোচিং করান। যে ছেলেটা একসময় নিজের জীবন গোছাতে হিমশিম খেত, সে ই এখন অন্যদের পথ দেখায়। জীবনটা এভাবেই চলছিল, যতক্ষণ না উগান্ডা থেকে খবর আসে।
গত ২৭ আগস্ট মারা যান কামুরাসির চাচাতো ভাই, তোরো রাজ্যের রাজা ওয়ো নিয়িম্বা । মাত্র তিন বছর বয়সে সিংহাসনে বসে বিশ্বের কনিষ্ঠতম রাজা হয়েছিলেন যিনি, মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৩৪। কামুরাসির রাজবংশের রক্ত সেখান থেকেই।
তার দাদা রাজা জর্জ রুকিদি তৃতীয় তোরো শাসন করেছেন ১৯২৮ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত, ১৯৫৪ সালে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকেও স্বাগত জানিয়েছিলেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় বাবিইতো রাজবংশের উত্তরাধিকার কমিটি প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয় কামুরাসিকেই। ৫ সেপ্টেম্বরের সভায় উপস্থিত ১৮ সদস্যের ১৫ জনই ভোট দেন তার পক্ষে।

লন্ডনের ফুটবল মাঠ থেকে হঠাৎ একটা সিংহাসন, এমন খবরে গোটা উগান্ডা তখন উত্তাল। কিন্তু কামুরাসি রাজি হননি। কমিটির সদস্য ফাদার চার্লস ওয়ো পরে জানান, নিজের দায়িত্বের কথা বলে রাজা হতে অপারগতা জানান কামুরাসি। যে মানুষটা একদিন জেলের সেল থেকে নিজেকে নতুন করে গড়েছিলেন, সেই মানুষটাই এবার আরেকটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন, শুধু এবার ফেরার পথ বেছে নিলেন লন্ডনের দিকেই।
তার জায়গায় রাজা হন প্রিন্স এডওয়ার্ড রুকিদি কিজানানগোমা, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের সংবাদ উপস্থাপক। তবে এই সিদ্ধান্তও নির্বিঘ্নে মেনে নেয়নি সবাই, রাজা ওয়োর মা ও বোন একটি উইলের কথা বলে দাবি তুলেছেন, সিংহাসনে বসার কথা ছিল ওয়োর নিজের ছেলের।
আর কামুরাসি? সেই সপ্তাহের শেষেই এফএ কাপে এরিথ টাউনের বিপক্ষে মাঠে ছিলেন, গোলপোস্টের নিচে সেই পরিচিত ভঙ্গিতে। রাজমুকুট হাতছাড়া হয়েছে, কিন্তু গ্লাভস জোড়া এখনও তারই হাতে, সেটাই তাঁর সত্যিকারের সিংহাসন।











