ডারউইনের মারারা মাঠ এতদিন ছিল নিছক একটা ঠিকানা। চতুর্থ দিনের বিকেলে সেটাই হয়ে গেল তীর্থস্থান, যেখানে তেইশ বছরের নির্বাসন ভেঙে বাংলাদেশ লিখল ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়।
প্রত্যাশা ছিল মাটির কাছাকাছি—ভালো লড়াই, না পারলে সম্মানজনক ড্র। প্রস্তুতি ম্যাচে ৫৪ রানে গুটিয়ে যাওয়া দলটার কাছে ৯ উইকেটের জয় স্বপ্নেও ছিল না। অথচ সেই দলই প্রতিটা সেশনে কোণঠাসা করে রাখল অস্ট্রেলিয়াকে। অস্ট্রেলিয়ান দর্শকরা ভেবেছিলেন ম্যাচ শেষ হবে তৃতীয় দিনেই , এর মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া জিতে যাবে , চতুর্থ দিনের টিকিটই কাটেননি তারা, আর সেই চতুর্থ দিনেই স্বাগতিকদের তুলোধুনো করে ম্যাচ শেষ করে দিল বাংলাদেশ।
সিরিজের আগে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল বোলিং নিয়ে। কেন্টে ধার বাড়িয়ে আসা হাসান মাহমুদ সেই দুশ্চিন্তা একাই দমিয়ে দিলেন—৫৫ রানে ৬ উইকেট। এবাদত আর তাসকিনও নিলেন দুটি করে। ৫৩ ওভারেই ১৯৮ রানে গুটিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া, নিজেদের মাঠে, নিজেদের দর্শকদের সামনে।

জবাবে শুরুটা মসৃণ ছিল না, দ্রুত ফিরলেন সাদমান। কিন্তু তানজিদ হাসান তামিম যেন ঠিক করেই রেখেছিলেন এই মাটিতে লিখবেন নিজের নাম—১০১ রানের ইনিংসে গড়লেন ভিত। মুমিনুলের ৪৯, শান্তর ৮৪ মাঝের সারিতে টানলেন স্থিতিশীলতার সুতো। এরপর একুশ বছরের ক্যারিয়ারে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নামা মুশফিকুর রহিম ৩৬ রানে প্রমাণ করলেন, বয়স তার পক্ষেই আছে এখনও। লিটন দ্রুত ফিরলে ধস নামার শঙ্কা জাগে, কিন্তু ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে যান মিরাজ। ৬৫ রানের ইনিংসে টেল এন্ডার ব্যাটসম্যানদের নিয়ে গড়েন অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ—হাসান, তাইজুল, তাসকিন প্রত্যেকেই রাখেন অবদান। ১৩৮ ওভার ঘাম ঝরিয়ে বাংলাদেশ তোলে ৪২৬। হ্যাজেলউডের ৬ উইকেট তখন নিছক সান্ত্বনা।
২২৮ রানের লিড নিয়ে নামা অস্ট্রেলিয়ার মেরুদণ্ড আবার ভাঙেন হাসান মাহমুদ। চতুর্থ দিনের শুরুতে মিরাজ নেন আরও দুই উইকেট, ম্যাচের রাশ পুরোপুরি চলে আসে বাংলাদেশের হাতে। ক্যামেরুন গ্রিনের ১০৪ রানের একক লড়াই সময় কেনে কিছুটা, যথেষ্ট হয় না। মিরাজ শেষমেশ নেন ৫ উইকেট, হাসান আরও ৩টি—২৮৪ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। লক্ষ্য দাঁড়ায় মোটে ৫৭।
তানজিদ শূন্য রানে ফিরলে ছোট্ট এক ধাক্কা লাগে, কিন্তু এরপর আর কোনো নাটক হতে দেননি সাদমান আর মুমিনুল। ধীরে, নিশ্চিন্তে, ১৪.২ ওভারেই লক্ষ্য পেরিয়ে বাংলাদেশ লিখে ফেলে ইতিহাস।

শ্রীলঙ্কা যেখানে কখনও অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জেতেনি, পাকিস্তান যেখানে শেষ জিতেছিল প্রায় তিন দশক আগে—সেই তালিকায় বাংলাদেশ নাম লেখাল আরও বিস্ময়কর ভঙ্গিতে। প্রতিটা সেশনে দাপট, চতুর্থ দিনেই সমাপ্তি, তাও ৯ উইকেটের ব্যবধানে। ডারউইনের রোদে পোড়া মাঠে সেদিন লেখা হলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন এক অধ্যায়ের প্রথম পাতা।











