জহির, আব বাস…

সবেক এই পাকিস্তানি গ্রেট অবিস্মরণীয় এক ক্রিকেট চরিত্র। সেটা খেলোয়াড় হিসেবে কিংবা খেলোয়াড়ী জীবন ছাড়ার পরও। ১৯৮৫ সালে তিনি মাঠের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান। ২০১৫ সালে হন আইসিসির সভাপতি। সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে আইসিসির শীর্ষপদে এর আগে আসীন হতে পেরেছেন কেবল দু’জন - কলিন কাউড্রে ও ক্লাইভ ওয়ালকট।

তখন ১৯৮৯ সাল। পাকিস্তান সফরে গেছে ভারতীয় দল। তখন, মোহাম্মদ আজহারউদ্দীনের ফর্মটা একটু নড়বড়ে।

একদিন করাচিতে চলছিল অনুশীলন। বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে কাঁচা-পাকা চুলের সদ্য সাবেক হওয়া এক ভদ্রলোক অনুশীলন দেখছেন। ক’দিন আগেও তিনি চশমা পরে ব্যাট হাতে বাইশ গজে অসংখ্য বোলারের রাতের ঘুম হারাম করেছেন। আজহারউদ্দীনকে দেখে এগিয়ে আসলেন, ব্যাটিংয়ের গ্রিপটা একটু পাল্টে দিলেন। আত্মবিশ্বাসই বদলে গেল আজহারউদ্দীনের।

অনেক পরে এসে আজহারউদ্দীন বলেন, ‘যখন গ্রিপটা বদলে ফেললাম, তখন থেকেই আরো স্বস্তি পেতে শুরু করলাম। আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়ে সহজাত খেলায় ফিরলাম। ধীরে ধীরে এই ব্যাপারটা আমাকে আরো বেশি আক্রমণাত্মক ক্রিকেটারে পরিণত করলো।’

সেই ভদ্রলোকটি হলেন জহির খান। সবেক এই পাকিস্তানি গ্রেট অবিস্মরণীয় এক ক্রিকেট চরিত্র। সেটা খেলোয়াড় হিসেবে কিংবা খেলোয়াড়ী জীবন ছাড়ার পরও। ১৯৮৫ সালে তিনি মাঠের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান। ২০১৫ সালে হন আইসিসির সভাপতি। সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে আইসিসির শীর্ষপদে এর আগে আসীন হতে পেরেছেন কেবল দু’জন – কলিন কাউড্রে ও ক্লাইপ ওয়ালকট।

একালের ক্রিকেট ভক্তদের কাছে তাঁর নামটা হয়তো খুবই অপরিচিত ঠেকবে। কিংবা অন্যভাবে বললে, তাঁর অর্জনগুলোর ব্যাপারে অনেকেই ওয়াকিবহাল হবেন না।

তাঁদের উদ্দেশ্যে বলা, জহির আব্বাসকে বলা হত দক্ষিণ এশিয়ান ব্র্যাডম্যান। এটা ঠিক কথার কথা নয়, তার রেকর্ডগুলো আক্ষরিক অর্থেই ছিল ব্র্যাডম্যানিয়। ১৬ বছরের ক্যারিয়ারের পুরোটাই ক্লাসিক, স্টাইল আর ফিটনেস ধরে রাখার অনন্য এক নজীর।

এশিয়া মহাদেশে এই জহির আব্বাসই একমাত্র ব্যাটসম্যান যার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০০ টি সেঞ্চুরি আছে। একই প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তিনি দু’টি সেঞ্চুরি করেছেন, এমন ঘটনা ঘটেছে আটবার।

শততম প্রথম শ্রেণি সেঞ্চুরির মাইলফলক ছুঁয়েছেন, এমন ব্যাটসম্যান ক্রিকেটের ইতিহাসে আছেন ২৫ জন। তারপরও, আলাদা জহির আব্বাস। প্রথম শ্রেণিতে ১০৮ টি সেঞ্চুরির মালিক আব্বাস ইতিহাসের মাত্র একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি এই ফরম্যাটে চারবার একই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ডাবল সেঞ্চুরি পেয়েছেন। আর প্রতিটি ইনিংসেই ছিলেন অপরাজিত।

এটুকুতেই বোঝা যায়, সাদা পোশাকে তিনি কি প্রকাণ্ড একটা চরিত্র ছিলেন!

ওয়ানডেতেও তিনি ছিলেন বড় তারকা। তিনিই প্রথম ওয়ানডে ব্যাটসম্যান হিসেবে টানা তিন ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করেছিলেন। সেটা ছিল ১৯৮২ সালের ঘটনা। ওই সময় টানা সাতটি আন্তর্জাতিক ইনিংসের ছয়টিতেই তিনি সেঞ্চুরি করেন। এর মধ্যে একটা ছিল ডাবল সেঞ্চুরি।

১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে তিনি টানা ২১৫ দিন ওয়ানডে ব্যাটসম্যানদের র‌্যাংকিংয়ে ছিলেন শীর্ষে। ওয়ানডে ব্যাটিংয়ে তাঁর সর্বোচ্চ রেটিং পয়েন্ট ৯৩১। এর চেয়ে ওপরে কেবল একজনই যেতে পেরেছেন। তিনি হলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ডস।

বলাই যায় যে, নিজের সময়ে যেকোনো ফরম্যাটে তিনি বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন জহির আব্বাস। আবার, নব্বই দশকের আগে ‘জেড’ ডাকনামের জহির আব্বাসকে বিশ্বেরই সেরা ব্যাটসম্যান বলে দেওয়া যায়।

কারণ, ১৯৯০ সালের আগ পর্যন্ত ব্যাটিং গড়ে জহির আব্বাসের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন কেবল একজনই, ওই সেই ভিভ রিচার্ডস। কমপক্ষে দুই হাজার রান করেছেন, এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে স্ট্রাইক রেটের দিক থেকে তিনি ছিলেন চতুর্থ অবস্থানে।

অধিনায়ক হিসেবে খুব অল্প কয়েকদিন কাটালেও তিনি ছিলেন সেরাদের কাতারে। যে ১৪ টি টেস্ট ম্যাচ তিনি পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দেন, তাতে পাকিস্তান হারে কেবল একটিতে।

আব্বাসের প্রিয় প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপক্ষে ১৯ টেস্ট খেলে করেছেন ছয়টি সেঞ্চুরি, গড় ৮৭! আর ১৩ টি ওয়ানডেতে তিন সেঞ্চুরিতে করেন ৬১২ রান।

সুনীল গাভাস্কার হলেন জহির আব্বাসের সমসাময়িক। সাবেক এই ভারতীয় অধিনায়ক একবার কোনো ভাবেই যখন আব্বাসকে আউট করা যেত না, তখন ভারতীয় খেলোয়াড়রা বলতেন, ‘জহির, আব বাস কারো’। অর্থ হল, ‘জহির, এবার তো থামো!’

যদিও, ব্যক্তিজীবনে ভারতেই তিনি ‘ক্লিন বোল্ড’ হয়েছেন। আশির দশকে ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলতে গিয়ে রিতা লুথরা সামিনা (সামিনা আব্বাস) নামের এক ভারতীয় নারীর প্রেমে পড়েন। কানপুরের স্বরূপ নগরের এই নারীই এখন জহির আব্বাসের ঘরনী। দ্বিতীয় প্রজন্মেও ভারতের সাথে সম্পর্কটা ধরে রেখেছেন আব্বাস। তার মেয়ে সোনাল আব্বাসের বিয়ে হয়েছে দিল্লীর এক ব্যবসায়ীর সাথে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...