ড্যানভিলের ওভালে সেদিন টস জিতে ফিল্ডিং নিয়েছিলেন স্টিভ ওয়াহ, আর সেই সিদ্ধান্তই যেন ভবিষ্যৎ লিখে দিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে গিয়েছিল মাত্র ৯৭ রানে—ম্যাকগ্রা আর ব্রেট লি দুজনেই নিয়েছিলেন তিনটি করে উইকেট, বল যেন উইকেটের ঠিক ওপর দিয়ে হাওয়ায় ভেসে এসে আছড়ে পড়ছিল ব্যাটসম্যানদের প্যাডে।
জবাবে অস্ট্রেলিয়া তুলেছিল ৪০৭ রান, ৭ উইকেটে ডিক্লেয়ার করে। ম্যাচসেরা হয়েছিলেন অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ নিজেই—অপরাজিত ১০০ রানের ইনিংসে যেন প্রমাণ করেছিলেন, বয়স তাঁর ব্যাটে এতটুকু মরচে ধরাতে পারেনি। শেষ ইনিংসেও বাংলাদেশ পারেনি দাঁড়াতে, ১৭৮ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস ও ১৩২ রানের বিশাল হারে শুরু হয়েছিল সফর।
সেই অস্ট্রেলিয়া দলটার দিকে তাকালে মনে হয়, ক্রিকেট ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগ যেন একসাথে মাঠে নেমেছিল। জাস্টিন ল্যাঙ্গার আর ম্যাথু হেইডেনের ওপেনিং জুটি, তিনে রিকি পন্টিং, চারে ড্যারেন লেহম্যান, পাঁচে অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ, ছয়ে মার্টিন লাভ, সাতে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট—আর বোলিংয়ে গ্লেন ম্যাকগ্রা, ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পি আর স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের মতো অস্ত্র।

কেয়ার্নসের দ্বিতীয় টেস্টে যেন আরও নির্মম হয়ে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ২৯৫ রান তুলেও শেষরক্ষা হয়নি, কারণ জবাবে অস্ট্রেলিয়া নেমেছিল রেকর্ড গড়ার নেশায়। ড্যারেন লেহম্যান খেলেছিলেন ২০৭ বলে ১৭৭ রানের ইনিংস—তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ স্কোর, যা তিনি গড়েছিলেন ঠিক এই বাংলাদেশের বিপক্ষেই। স্টিভ ওয়াহ আবারও অপরাজিত ১৫৬ রানে, মার্টিন লাভ অপরাজিত ১০০ রানে—দুজনে মিলে অবিচ্ছিন্ন জুটিতে অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গিয়েছিলেন ৫৫৬/৪ ডিক্লেয়ারে।
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসেও ১৬৩ রানে গুটিয়ে যায়, হার আসে ইনিংস ও ৯৮ রানের ব্যবধানে। পুরো সিরিজে স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল একাই নিয়েছিলেন ১৭ উইকেট, হয়েছিলেন সিরিজসেরা—তাঁর গুগলি আর টার্নে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা রীতিমতো দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। আর দুই ইনিংস মিলিয়ে ২৮৭ রান তুলে সিরিজের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হন লেহম্যান নিজেই।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ গিডিয়ন হেইগের ভাষায়, সেই সময় কেয়ার্নস আর ডারউইনের সম্মিলিত জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ মাঠে হাজির হয়েছিলেন এই সিরিজ দেখতে—উত্তর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট-ইতিহাসে যা ছিল বিরল এক উপলক্ষ। অথচ মাঠের ভেতরে বাংলাদেশের জন্য সেই উপলক্ষ পরিণত হয়েছিল একরাশ তিক্ত অভিজ্ঞতায়।

ঠিক ২৩ বছর পর সেই একই মাটিতে আবার পা রেখেছে বাংলাদেশ, আর এবার অস্ট্রেলিয়া বিষয়টি একেবারেই হালকাভাবে নেয়নি। প্যাট কামিন্সের নেতৃত্বে ঘোষিত দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে গ্রীষ্মে মাত্র তিনটি টেস্ট একসঙ্গে খেলতে পারা জশ হ্যাজেলউড আর নাথান লায়নকে, সঙ্গে আছেন কামিন্স নিজেও। স্টিভ স্মিথ, মিচেল স্টার্ক, মার্নাস লাবুশান, ট্র্যাভিস হেডের মতো নাম তো আছেই, সঙ্গে ক্যামেরুন গ্রিন, স্কট বোল্যান্ড, অ্যালেক্স কেয়ারি, জশ ইংলিস আর বো ওয়েবস্টারের মতো গভীরতাও। এক বছর পর প্রথমবার পূর্ণশক্তির স্কোয়াড মাঠে নামাতে চলেছে অস্ট্রেলিয়া—আর সেটা বাংলাদেশের বিপক্ষেই। বার্তাটা স্পষ্ট প্রতিপক্ষ যত ছোটই মনে হোক, সেরাদের ছাড়া নামতে রাজি নয় তারা।
ডারউইনের সেই স্টেডিয়ামেই শুরু হচ্ছে প্রথম টেস্ট, বাংলাদেশ দল ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে অস্ট্রেলিয়ায়। প্রশ্ন একটাই—২৩ বছর আগের সেই দুঃস্বপ্নের স্বাদ আবারও কি ফিরিয়ে দেবে এই পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়া, নাকি এবার নতুন কোনো ইতিহাস লেখা হবে?











