ক্রিকেটারের নামে ক্রিকেটার

শচীন টেন্ডুলকারের অভিষেকের ঠিক একদিন আগে কেরালায় এক দম্পত্তি জন্ম দিয়েছিলেন এক বাচ্চার। বাবা পি সি বেবি পরদিন চার্চে গেছেন ছেলের জন্য প্রার্থনা করতে। সেখানে গিয়ে রেডিওতে শুনলেন টেন্ডুলকারের অভিষেক। এবং সেখানেই টেন্ডুলকার সম্পর্কে জানলেন।

ক্রিকেটারদের নামকরণ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। কেউ বাবার নাম ধারণ করেন, কেউ পরিবারের কারো নাম ধারণ করেন; আবার কেউ বিখ্যাত কারো নামে রাখেন ছেলের নাম। কিন্তু এরকম কিছু ক্রিকেটার খুজে পাওয়া গেলো, যাদের নাম আসলে অন্য কোনো ক্রিকেটারের নামেই রাখা হয়েছে।

এই ক্রিকেটাররাই জন্মেছেনই যেনো ক্রিকেটার হওয়ার জন্য। কারণ নামকরণের সময়ই বাবা-মা বেছে নিয়েছেন কোনো ক্রিকেটারকে। এরকম কয়েক জন ক্রিকেটারের খোজ নেওয়া যাক।

  • কার্টলি অ্যামব্রোস

অ্যামব্রোসের পুরো নাম গলো কার্টলি এলকন লিনওয়াল অ্যামব্রোস।

অনেক আগে থেকেই এটা প্রচলিত ছিলো যে, তার নামের তৃতীয় অংশটা একজন ক্রিকেটারের নাম থেকে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার ফাস্ট বোলারে রে লিনডওয়ালের নাম থেকে তার নাম এসেছে বলেই মরেন করা হতো। কিন্তু ২০০৩ সালে ‘সান’ পত্রিকা বললো, এন্টিগার ফাস্ট বোলার অ্যাম্ব্রোসের নামের সাথে আরও একটা ক্রিকেটীয় গল্প আছে।

অ্যাম্ব্রোসের নামের প্রথম অংশ, অর্থাৎ কার্টলি এসেছে কার্টলি নামে একজন যাজকের নাম থেকে। এই যাজক ছিলেন লিওয়ার্ডস দ্বীপে। তিনিই ১৯৬৩ সালে অ্যাম্ব্রোসকে ব্যাপ্টাইজ করেন। কিন্তু এই যাজকের সাথে ক্রিকেটের সম্পর্ক কী?

আছে। এই যাজকের নাতি জেমস কার্টলি পরে সাসেক্স ও ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন। তিনিও ফাস্ট বোলার হয়েছিলেন!

  • রোহান গাভাস্কার

এই গল্পটা মোটামুটিসবার জানা। সুনীল গাভাস্কারের প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের রোহান কানহাই। দু জনে পরষ্পরের বিপক্ষে অনেক খেলেছেন। এ ছাড়া ১৯৭১-৭২ সালে বিশ্ব একাদশের অস্ট্রেলিয়া সফরে দু জন সতীর্থও ছিলেন। ফলে ছেলের নাম রাখার সময় সুনীল প্রিয় খেলোয়াড়ের নামই বেছে নিলেন।

কিন্তু গল্পটা এখানে শেষ নয়।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে একটা গল্প প্রচলিত ছিলো যে, রোহানের পুরো নাম হলো ‘রোহান জয়বিশ্ব গাভাস্কার’। রোহান তো বুঝতে পারলেন। এই জয়বিশ্ব এলো কোত্থেকে? জয় হলেন এমএল জয়সিমা এবং বিশ্ব হলেন গুন্ডাপ্পাবিশ্বনাথ; যিনি আবার রোহানের মামা। তার মানে, একব রোহান গাভাস্কারের নামে চার কিংবদন্তী ক্রিকেটার?

না, ক্রিকইনফোকে রোহান গাভাস্কার নিশ্চিত করেছেন, পরের গল্পটা ঠিক নয়। তার পুরো নাম: রোহান সুনীল গাভাস্কার।

  • নিল ফেয়ারব্রাদার

নিল হার্ভে ফেয়ারব্রাদার; পুরো নামটা শুনলে আর কিছু বুঝতে বাকি থাকে না।

অস্ট্রেলিয়ান বাহাতি ফাস্ট বোলার নিল হার্ভের দারুণ ভক্ত ছিলেন ফেয়ারব্রাদারের মা। তিনি ছেলের নাম রাখেন সেই ফাস্ট বোলারের নামে। ফেয়ারব্রাদার নিজেও কার্যকর বাহাতি ক্রিকেটারে পরিণত হন। ল্যাঙ্কারশায়ারের হয়ে ভালো ক্যারিয়ার কাটিয়েছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে ওয়ানডে খেলেছেন বেশ কিছুদিন। ১০টা টেস্টও খেলেছেন। মনে করা হয়, তিনি আর্ন্তজাতিক ক্রিকেটে যথেষ্ঠ সুযোগ পাননি।

  • কেনি বেনজামিন

এই নামটা শুনলে আপনি কিছু অনুমান করতে পারবেন না। পুরো নামটা শুনুন: কেনেথ চার্লি গ্রিফিথ বেনজামিন।

হ্যা, এবার ঠিকই লাফ দিয়ে উঠেছেন। ঠিক ধরেছেন। কেনি বেনজামিনের পুরো নামটা এসেছে ষাটের দশকের ত্রাস ফাস্ট বোলার চার্লি গ্রিফিতের কাছ থেকে। ২৮ টেস্টে ৯৪ উইকেট নেওয়া গ্রিফিথ আর ওয়েস হলের ফাস্ট বোলিং জুটি ছিলো রূপকথার দানবদের মতো।

বাবা মা শখ করে ছেলের নাম রেখেছিলেন সেই গ্রিফিথের নামে। কালক্রমে কেনি নিজেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে আর্ন্তজাতিক খেললেন। তার ক্যারিয়ার জানেন? ঠিক ২৮ টেস্টে ৯২ উইকেট! দুই উইকেটের জন্য গ্রিফিটকে ছুতে পারেননি!

  • নিক কম্পটন

এমনিতে নিকের নামের শেষে কম্পটন যে থাকবে, তাতে বিশেষ আলোচনার কিছু নেই। কারণ তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্রিকেটার ও ফুটবলার ডেনিস কম্পটনের নাতি। আলোচনাটা হলো নিকের বাবা একটা কাজ করেছিলেন।

ছেলের জন্মের পর তার নাম ডেনিস কম্পটনই রেখেছিলেন। পরে তার পুরো নাম হয় নিক ডেনস কম্পটন। কালক্রমে নিক তার দাদার পথ ধরে মিডলসেক্স হয়ে জাতীয় দলে আসেন। অবশ্য ক্যারিয়ারটা দাদার মতো গৌরবের করতে পারেননি।

  • অ্যালেক ও এরিক বেডসার

বেডসাররা জমজ ভাই হিসেবে ওয়াহ ভাইদের আগে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন। বেডসার জুটির নাম এসেছিলো আরেক খ্যাতনামা বেডসার জুটির কাছ থেকে।

তখন সারেতে দুই ভাই খুব চুটিয়ে খেলতেন। তাদের নাম ছিলো এরিক বেডসার ও অ্যালেক বেডসার। সেই দক্ষিণ আফ্রিকায় বসে এক দম্পত্তি তাদের খেলায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। ফলে তাদের যখন জমজ ছেলে হলো, সারের দু জনের নামেই নাম রাখলেন। আর কালক্রমে সারের দু জনকে ছাপিয়ে এই বেসার ভাইয়েরা টেস্ট ক্রিকেটও জয় করে ফেললেন।

  • নিক নাইট

নিক নাইটের গল্পটাও জানতে গেলে পুরো নাম শুনতে হবে: নিক ভেরিটি নাইট।

এবার আসেন ভেরিটি সম্পর্কে বলা যাক। হেডলি ভেরিটি ছিলেন ইংল্যান্ডের বাহাতি স্পিনার। ৪০টি টেস্ট খেলেছেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত হন তিনি। পরে নিকের বাবা তার দুই ছেলের নামের মাঝেই ভেরিটি যোগ করেন।

এখানে একটা ব্যাপার মনে রাখা দরকার, নিকের বাবা কিন্তু ক্রিকেটার হিসেবে ভেরিটির নামকে বেছে নেননি। ভেরিটি ছিলেন তাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। পরে সেই আত্মীয়র পথ ধরে নিক টেস্ট খেলে ফেলেন।

  • কলিন ক্রফট

আবারও পুরো নাম শুনতে হবে।

ত্রাস ফাস্ট বোলার কলিন ক্রফটের পুরো নাম হলো: কলিন এভারটন হান্ট ক্রফট। হ্যা, ঠিক ধরে ফেলেছেন। এভারটন উইকস আর কনরাড হান্টের নামে নাম।

মানে, এক ক্রফটের নামের মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই কিংবদন্তীর বাস। বাবা-মা খুবই ক্রিকেটভক্ত ছিলেন বলে ছেলের নামে দুই কিংবদন্তীর নাম বসিয়ে দিয়েছিলেন। ক্রফটও সেই পথেই চলেছেন।

এখানে এভারটন উইকসের নাম সম্পর্কে একটা মজার তথ্য জানিয়ে রাখা যাক। এভারটনের নামটা বাবা বেছে নিয়েছিলেন প্রিয় ফুটবল ক্লাব এভারটন এফসি থেকে। এই কথা শুনে জিম লেকার বলেছিলেন, ‘ভাগ্যিস ওনার বাবা ওয়েস্ট ব্রুমউইচ এলবিওনের সমর্থক ছিলেন না!’

  • শচীন বেবি

১৯৮৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর; শচীন টেন্ডুলকারের অভিষেকের ঠিক একদিন আগে কেরালায় এক দম্পত্তি জন্ম দিয়েছিলেন এক বাচ্চার। বাবা পি সি বেবি পরদিন চার্চে গেছেন ছেলের জন্য প্রার্থনা করতে। সেখানে গিয়ে রেডিওতে শুনলেন টেন্ডুলকারের অভিষেক। এবং সেখানেই টেন্ডুলকার সম্পর্কে জানলেন।

টেন্ডুলকারের ভবিষ্যত তখনও পি সি বেবি জানেন না। কিন্তু কিশোর এই ব্যাটসম্যানের উত্থান সম্পর্কে জেনেই মুগ্ধ হলেন। বাড়ি ফিরে ছেলের নাম রাখলেন শচীন বেবি। ২১ বছর বয়সী শচীন ইতিমধ্যে তরুন প্রতিভা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...