ফুটবল প্রেমীদের কাছে ‘হেক্সা’ শব্দটি এখন আর কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এক দুর্ভেদ্য রহস্যের নাম। সবুজ গালিচায় যখন কোনো দল নিজেদের পঞ্চম শিরোপাটি উঁচিয়ে ধরে, তখন সমর্থকরা রঙিন স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন ষষ্ঠ মুকুটের। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই পাঁচ এবং ছয়ের মাঝখানে রয়েছে এক বিশাল অদৃশ্য দেওয়াল।
পরিসংখ্যান বলছে, ক্লাব ফুটবল থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ – কোনো পরাশক্তিই পঞ্চম শিরোপার পর ষষ্ঠটির দেখা সহজে পায়নি। ইউরোপীয় ফুটবলের অভিজাত আঙিনায় তাকালে এই বিষাদসিন্ধুর গভীরতা বোঝা যায়।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের রাজা হিসেবে পরিচিত রিয়াল মাদ্রিদও এই চক্র থেকে রেহাই পায়নি। নিজেদের পঞ্চম শিরোপা জেতার পর ষষ্ঠবার ইউরোপ সেরা হতে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘ অর্ধযুগ। যদিও অন্যান্যদের তুলনায় রিয়ালই সবচেয়ে কম সময়ে এই দেওয়াল ভাঙতে পেরেছে, তবুও সেই ছয়টি বছর তাদের কাটাতে হয়েছিল চরম অস্থিরতায়।

ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলান যখন তাদের পঞ্চম শিরোপাটি হাতে পায়, ভক্তরা ভেবেছিলেন ষষ্ঠটি বোধহয় হাতের নাগালেই। অথচ সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি আসতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ নয়টি বছর।
একই আক্ষেপে পুড়েছে জার্মানির সফলতম ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম শক্তি লিভারপুল। বায়ার্নকে তাদের ষষ্ঠ শিরোপার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে সাতটি বছর।
অন্যদিকে লিভারপুলের গল্পটি আরও বেশি দীর্ঘশ্বাসের। ২০০৫ সালে পঞ্চম শিরোপা জেতার পর তাদের ষষ্ঠ মুকুটটি মাথায় তুলতে সময় লেগেছে দীর্ঘ দেড় দশক বা ১৫টি বছর। প্রজন্মের বদল হয়েছে, কোচ বদলেছে, কিন্তু হেক্সার সেই অভিশাপ ভাঙতে তাদের দীর্ঘ সময় লড়াই করতে হয়েছে।

বর্তমানে এই ‘হেক্সা’ বা ষষ্ঠ শিরোপার নেশায় বুঁদ হয়ে আছে ফুটবল বিশ্বের দুই পরাশক্তি – ব্রাজিল এবং বার্সেলোনা। ২০০২ সালে নিজেদের পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতার পর ব্রাজিল যেন এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে। ২৪ বছর ধরে পাঁচটি বিশ্বকাপ ক্যাম্পেইন শেষ হলেও হেক্সা জয় আজও সাম্বার দেশের কাছে এক অধরা স্বপ্ন।
অন্যদিকে ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনাও ২০১৫ সালের পর থেকে প্রায় এক যুগ ধরে ষষ্ঠ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফিটি ছোঁয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবারই বুকভরা আশা নিয়ে তারা যাত্রা শুরু করে, কিন্তু শেষমেশ সেই পাঁচ এর মায়াজাল আর ছিন্ন করা সম্ভব হয় না।
ফুটবল আসলে কেবল পায়ের শৈলী নয়, মাঝে মাঝে তা যেন নিয়তির খেলাও বটে। অনেক দলই পাঁচ এর ঘরে এসে এক গভীর স্থবিরতায় আটকে আছে বছরের পর বছর। অনেকেই হয়তো একদিন এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবে, কেউ হয়তো ইতিহাসের পাতায় নতুন বীরত্বগাথা লিখবে। তবে ফুটবলের এই হেক্সা রহস্য সমর্থকদের মনে এক অমীমাংসিত রোমাঞ্চ আর কিছুটা ভয়ের নাম হয়েই টিকে থাকবে।












