পাশ্চাত্যের আভিজাত্যে ক্যালিপসোর ছন্দ

মাত্র ১৪ বছর বয়সে জন্মভূমি ছেড়ে মায়ের সাথে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। ভর্তি হন রিডিং শহরের বার্কশায়ার হাইস্কুলে। সেখানে হাজারটা প্রতিকূলতার মাঝেও ক্রিকেটকে ভুলে যান নি তিনি, সাদা চামড়ার ব্রিটিশদের বর্ণবিদ্বেষের জবাব দিয়েছেন ব্যাট হাতে। তবে একটা কথা না বলে পারছি না, গ্রিনিজের দুর্ভেদ্য রক্ষণের ভিতটা তৈরি হয়েছিল স্থানীয় ইংলিশ কোচদের হাতেই। পরিশুদ্ধ ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টে ইংরেজি বলাটাও রপ্ত করেছেন সেখান থেকেই।

ক্রিকেটীয় ফোকলোরের কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া গ্রিনিজ-হেইন্স জুটির কথা কে না জানে? সত্তর দশকের শেষভাগ ও আশির দশকের গোড়ার দিকে, বিশ্ব ক্রিকেটে ক্যারিবীয় সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম রূপকার ছিলেন এই দুই বার্বাডিয়ান ভদ্রলোক। মারমুখো গ্রিনিজের সাথে ধীরলয়ের হেইন্সের রসায়নটা জমত ভারি। বলা হত, দে অয়্যার মেড ফর ইচ আদার।

ক্রিকেট ইতিহাসের সবচাইতে ‘আইকনিক’ উদ্বোধনী জুটির অর্ধেক অংশীদার গর্ডন গ্রিনিজ হলেন সেই ব্যক্তি যার ব্যাটে পাশ্চাত্যের আভিজাত্যের সাথে ক্যালিপসো সুরের ছন্দ মিলেমিশে একাকার হয়েছিল।

গ্রিনিজের জন্ম ১৯৫১ সালের এক মে, বারবাডোজের সেন্ট পিটার্সে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে জন্মভূমি ছেড়ে মায়ের সাথে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। ভর্তি হন রিডিং শহরের বার্কশায়ার হাইস্কুলে। সেখানে হাজারটা প্রতিকূলতার মাঝেও ক্রিকেটকে ভুলে যান নি তিনি, সাদা চামড়ার ব্রিটিশদের বর্ণবিদ্বেষের জবাব দিয়েছেন ব্যাট হাতে। তবে একটা কথা না বলে পারছি না, গ্রিনিজের দুর্ভেদ্য রক্ষণের ভিতটা তৈরি হয়েছিল স্থানীয় ইংলিশ কোচদের হাতেই। পরিশুদ্ধ ব্রিটিশ অ্যাক্সেন্টে ইংরেজি বলাটাও রপ্ত করেছেন সেখান থেকেই।

গর্ডন গ্রিনিজের ডিফেন্স ছিল ইংরেজদের মতই জমাট, নিশ্ছিদ্র। তবে আর দশটা ক্যারিবিয়ানের মত গ্রিনিজও ছিলেন আজন্ম আগ্রাসনের পূজারি। মারার বল পেলে একচুল পরিমাণও ছাড় দিতেন না। গ্রিনিজকে তাঁর সময়ের সবচেয়ে নিখুঁত ক্লিন হিটারদের একজন বলেও রায় দিয়েছেন অনেকে।

উইজডেনের ভাষায়, ‘He was a superb technician, who learned solid defensive techniques on the pudding pitches of his childhood in England and then allied them to an uninhibited Caribbean heritage.’

পেস বোলিংয়ের বিপক্ষে গ্রিনিজ ছিলেন বরাবরই স্বচ্ছন্দ এবং আত্মবিশ্বাসী। বিশেষত নতুন বলের সুইং সামলানোয় তাঁর ছিল অসামান্য দক্ষতা। বলের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে যতটা সম্ভব সোজা ব্যাটে খেলতেন। পেসারদের বিপক্ষে গ্রিনিজের খেলা কপিবুক স্ট্রেট ড্রাইভগুলো তাঁর সেই সামর্থ্যের কথাই জানান দেয়।

 

ফাস্ট বোলারদের শর্ট পিচ বোলিংয়েও স্বচ্ছন্দ ছিলেন গ্রিনিজ। বাউন্সার দেখলে মোটেও ভড়কে যেতেন না। পুল-হুক খেলার জন্য সদা প্রস্তুত রাখতেন নিজেকে। বাউন্সার সামলানোর কৌশলটা যে জন্মভূমি বারবাডোজ থেকেই শিখে এসেছেন তিনি।

গ্রিনিজের ট্রেডমার্ক শট ছিল সামনের পা তুলে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খেলা মোহনীয় ভঙ্গিমার ‘ওয়ান লেগড পুল’। আর ছিল পাওয়ারফুল স্কয়ার কাট। পয়েন্ট ও গালির মাঝখান দিয়ে অমন ক্ষিপ্রতাসম্পন্ন, নিখুঁত স্কয়ার কাট ক্রিকেটের ইতিহাসে খুব ব্যাটসম্যানই খেলতে পেরেছেন! তাছাড়া উইকেটের দুপাশেই চমৎকার ড্রাইভ খেলতেন গ্রিনিজ; তাঁর ‘ব্যাকফুট পাঞ্চ’ আর ‘ফ্লিক অফ দ্য হিপ’ও কম আকর্ষণীয় ছিল না। গ্রিনিজ সবসময় বলতেন, ‘Strokeplay should be purposeful. If you’re going to hit the ball, hit it.’

প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে গ্রিনিজের অভিষেক ১৯৭০ সালে কাউন্টি ক্লাব হ্যাম্পশায়ারের হয়ে। সাসেক্সের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে তেমন বড় কোন ইনিংস খেলেন নি। তবুও তাঁর ছোট্ট কিন্তু সাহসী ইনিংসটা সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। ইংল্যান্ডের দুর্ধর্ষ ফাস্ট বোলার জন স্নো’র বাউন্সারে হুক করে বল আছড়ে ফেলেছিলেন মাঠের বাইরে। পাশের একটা বাগান থেকে বলটা কুড়িয়ে আনতে নাকি সময় লেগেছিল পাক্কা ৭ মিনিট! ১৯ বছরের প্রাণোচ্ছ্বল তরুণ গ্রিনিজের ডেব্যু ইনিংসের ব্যাটিং নিয়ে উইজডেনের বক্তব্য ছিল, ‘one of the most promising innings on debut.’

হ্যাম্পশায়ারে থাকাকালীন উদ্বোধনী জুটিতে সঙ্গী হিসেবে গ্রিনিজ পেয়েছিলেন বয়সে ছয় বছরের বড় ব্যারি রিচার্ডসকে। অল্প সময়ের ভেতরেই দারুণ কেমিস্ট্রি গড়ে উঠেছিল দুজনের মধ্যে। রিচার্ডস-গ্রিনিজ জুটিকে কাউন্টির সর্বকালের সেরা ওপেনিং জুটির স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন অনেকে।

১৯৭৩ সালের কথা। কাউন্টিতে ফর্মের তুঙ্গে থাকা গ্রিনিজকে দলে নিতে ইংল্যান্ড তখন মরিয়া। এদিকে তাঁর আজীবনের লালিত স্বপ্ন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে টেস্ট খেলবেন। তাঁর সামনে তখন দুটি রাস্তা খোলা। ইংরেজদের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়বেন নাকি ফিরে যাবেন জন্মভূমিতে, প্রতিনিধিত্ব করবেন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের। শেষমেশ দ্বিতীয় অপশনকেই বেছে নিলেন তিনি।

ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) লোভনীয় প্রস্তাবকে উপেক্ষা করে ১৯৭৩ সালে তিনি ফিরে আসেন মাতৃভূমি বারবাডোজে। বারাডোজের ঘরোয়া লিগ ‘শেল ট্রফি’র দুই মৌসুম খেলে নিজেকে ক্যারিবিয়ান সংস্কৃতির সাথে নতুন করে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করেন। অবশেষে সুযোগ পেয়ে যান ভারত সফরের টেস্ট দলে।

গ্রিনিজ ও হেইন্স

মজার ব্যাপার হল, ওই একই সফরে ডাক পেয়েছিলেন স্যার ভিভ রিচার্ডসও। ১৯৭৪ সালে বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে একই ম্যাচে গ্রিনিজের সাথে টেস্ট ক্যাপ মাথায় তোলেন ভিভ। ডেব্যু টেস্টে ভিভ ব্যর্থ হলেও (দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৪ ও ৩ রান) অভিষেকের লগ্ন রাঙাতে ভুল করেন নি গ্রিনিজ। প্রথম ইনিংসে ৯৩ রানে আউট হওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে হাঁকান অনবদ্য সেঞ্চুরি (১০৭)।

১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত গ্রিনিজ ছিলেন ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে। এই নয় বছরে খেলা ৫৪ টেস্টে তাঁর সংগ্রহ ১০ সেঞ্চুরি আর ২৩ ফিফটিতে ৪১৪০ রান। ব্যাটিং গড় ৫৩.৭! ১৯৭৭ সালে জিতেছেন উইজডেন বর্ষসেরার পুরস্কার।

১৯৮৪ সালের জুনে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক সিরিজে দুটি ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান গ্রিনিজ। লর্ডসে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে উপহার দেন ২৪২ বলে ২১৪ রানের এক ‘মহাকাব্যিক’ ইনিংস! যার সুবাদে শেষদিনে মাত্র পাঁচ ঘন্টায় ৩৪২ রান তাড়া করে জিতেছিল উইন্ডিজ। মাত্র এক উইকেট হারিয়ে ৬৬.১ ওভার খেলেই! দিনের খেলা তখনও বাকি ছিল ১১.৫ ওভার। লর্ডসের ইতিহাসে এটাই চতুর্থ ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড।

গ্রিনিজের ইনিংসটাকে অসাধারণ বললেও কম বলা হবে। জয়ের নেশায় মরিয়া ইংরেজ অধিনায়ক ডেভিড গাওয়ারের ইনিংস ডিক্লেয়ারের সিদ্ধান্তকে রীতিমতো প্রহসন বানিয়ে ছেড়েছিলেন! ইট ওয়াজ ব্রুটাল, ইট ওয়াজ বিউটিফুল! হাঁকিয়েছিলেন ২৯টা চার আর দুইটা ছক্কা! ডাবল সেঞ্চুরির ল্যান্ডমার্ক ছুঁয়েছিলেন হুক শটে ছয় মেরে!

গ্রিনিজের একটি ‘পাওয়ারফুল’ স্ট্রেট ড্রাইভ দেখে ধারাভাষ্যকার রিচি বেনো বলেছিলেন, ‘Every little bit of power you could imagine going into that.’

ওল্ড ট্রাফোর্ডে সিরিজের চতুর্থ টেস্টেও ডাবল সেঞ্চুরি (২২৩) হাঁকান গ্রিনিজ। ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংল্যান্ডকেই ৫-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে ক্রিকেটের এক অমর উপাখ্যান রচনা করেছিল ক্যারিবীয়রা। পরবর্তীকালে যেটি ‘ব্ল্যাকওয়াশ সিরিজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

টেস্ট ক্যারিয়ারের শেষদিকে এসেও নিয়মিত রান পেয়েছেন গ্রিনিজ। ১৯৯১ সালে গায়ানার ব্রিজটাউনে খেলেন বিদায়ী টেস্ট। অথচ বারবাডোজে তার আগের টেস্টেই তিনি উপহার দিয়েছেন এক অনন্য ‘গ্রিনিজ মাস্টারক্লাস’! অস্ট্রেলিয়ান পেস অ্যাটাককে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলা গ্রিনিজের ক্যারিয়ার সেরা ২২৬ রানের সৌজন্যেই অ্যালান বোর্ডারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে ৩৪৩ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ডেভিড বুন, মার্ভ হিউজ, ডিন জোন্স, ক্রেইগ ম্যাকডারমট, ওয়াহ ব্রাদার্সদের নিয়ে গড়া অস্ট্রেলিয়া জাস্ট খড়কুটোর মত উড়ে গিয়েছিল।

গ্রিনিজের ২২৬ রানের স্পেশাল নক সম্পর্কে বিশিষ্ট ক্রীড়ালেখক ড্যানিয়েল হ্যারিস বলেছিলেন, ‘Gordon Greenidge’s 226 at Barbados, his highest Test score, in his penultimate Test match, to clinch a series; was the last flickering of greatness from a master craftsman.’

এবারে আসুন একটু পরিসংখ্যান কপচাই। প্রায় ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে গ্রিনিজ খেলেছেন ১০৮টি টেস্ট ও ১২৮টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

টেস্টে গ্রিনিজের সংগ্রহ ৪৪.৭২ গড়ে ৭৫৫৮ রান। ১৯টি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন, যার ৪টাই ডাবল। এছাড়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে গ্রিনিজের আছে ৩৭ হাজারের ওপরে রান, হাঁকিয়েছেন ৯২টা সেঞ্চুরি!

টেস্টের সাফল্যকে গ্রিনিজ টেনে নিয়ে গেছেন ওয়ানডেতেও। সাদা পোশাকের মতো রঙিন পোশাকের ক্রিকেটেও খেলেছেন দাপটের সাথে। পরিসংখ্যানও তাঁর হয়েই কথা বলছে।

’৭৫ আর ‘৭৯ বিশ্বকাপজয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অপরিহার্য সদস্য গ্রিনিজ ১২৮ ওয়ানডেতে ৪৫.০৩ গড়ে রান করেছেন ৫,১৩৪। হাঁকিয়েছেন ১১টি সেঞ্চুরি। এছাড়া ঘরোয়া একদিনের ক্রিকেটে ৩৩টি সেঞ্চুরিসহ তাঁর রয়েছে ১৬ হাজারের বেশি রান।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত মোট তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন গ্রিনিজ। বিশ্বকাপের ১৫ ম্যাচে গ্রিনিজের সংগ্রহ ৪৫.৫৬ গড়ে ৫৯১ রান। চারটি ফিফটির সাথে আছে দু’টি সেঞ্চুরিও। প্রথমটা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অভিষেক সেঞ্চুরি; ১৯৭৫ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে এজবাস্টনে। আর দ্বিতীয় শতরানটি এসেছিল ১৯৮৩ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্যারিয়ারের শততম ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্বটি গর্ডন গ্রিনিজের। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ১০২ রানের ইনিংস খেলার পথে এই কীর্তি গড়েন তিনি।

গর্ডন গ্রিনিজ ছিলেন একজন সত্যিকারের ম্যাচ উইনার। টেস্টে ৬ বার আর ওয়ানডেতে ১৮ বার জিতেছেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার। গ্রিনিজের ১১ ওয়ানডে সেঞ্চুরির ৯টিতেই জিতেছে তাঁর দল। আর টেস্টে? গ্রিনিজ যেসব ম্যাচে সেঞ্চুরি পেয়েছেন তার একটাতেও হারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

১৯৯১ সালে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়া গ্রিনিজ পরবর্তীতে সফলতা পেয়েছেন কোচ হিসেবেও। টাইগারদের ঐতিহাসিক ’৯৭ আইসিসি ট্রফি জয় এবং ’৯৯ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরমেন্সের নেপথ্য নায়কও ছিলেন এই বার্বাডিয়ান।

১৯৯৬ সালে গর্ডন গ্রিনিজের মতো একজন বিখ্যাত ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব যখন বাংলাদেশের কোচ হয়ে এলেন, পুরো জাতি তখন বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নে বিভোর। কেনিয়াতে অনুষ্ঠিত ’৯৪ আইসিসি ট্রফির ব্যর্থতা যখন আমাদের ’৯৬ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নকে ভুলণ্ঠিত করেছিল, তখন এদেশের ক্রিকেটকে সাফল্যের মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে সুদূর বার্বাডোজ থেকে এসেছিলেন ক্যারিবীয় ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের কাণ্ডারি গর্ডন গ্রিনিজ।

১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ার এসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। এসিসি ট্রফির সাফল্যের পরপরই বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড আটঘাট বেঁধে নামে জাতীয় দলকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে। সেই লক্ষ্যকে সফল করতে অসাধারণ এক উদ্যোগ ছিল গ্রিনিজকে বাংলাদেশের কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। তৎকালীন বোর্ড সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছিল সেটা। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে গ্রিনিজের জন্যও সেটি ছিল প্রথম অভিজ্ঞতা। তাঁর আসাটা এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মাঝে দারুণ উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে গ্রিনিজের ব্যাটিং দেখার সুখস্মৃতি তখনকার প্রজন্মের অনেকের মনেই ছিল টাটকা।

মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ’৯৭ আইসিসি ট্রফির পুরোটা সময় জুড়ে গ্রিনিজ ছিলেন বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের অনুপ্রেরণার উৎস। সেমিফাইনালে ওঠার পথে গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে কঠিন ম্যাচটা ছিল হল্যান্ডের বিপক্ষে; পেন্ডুলামের মতো দুলছিল যে ম্যাচের গতি-প্রকৃতি। এদিকে সমীকরণটাও ছিল এমন যে জিততেই হবে। একটু পর পর বৃষ্টির আনাগোনা, ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়ে বাদ পড়ার আশঙ্কা, সব মিলিয়ে ভয়ংকর স্নায়ুক্ষয়ী এক ম্যাচ ছিল সেটি।

হল্যান্ডের বেঁধে দেয়া ১৭২ রানের মামুলি টার্গেট তাড়া করতে নেমে শুরুতেই মাত্র ১৫ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে খাদের কিনারে বাংলাদেশ! অবশেষে অধিনায়ক আকরাম খানের ’নায়কোচিত’ ৬৮ রানের সৌজন্যে কোন রকমে হল্যান্ড বাধা পেরিয়ে শেষ চারে ওঠে বাংলাদেশ। সেই জয়ে অবদান ছিল গ্রিনিজেরও।

হল্যান্ডের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর ক্রিকইনফোর ম্যাচ রিপোর্টে বলা হয়েছিল- ‘গর্ডন গ্রিনিজ কাঁদছেন। একবার ভেবে দেখুন, তিনি কেন কাঁদবেন! তিনি তো এসেছেন ভিন্ন একটা দেশ, ভিন্ন একটা সংস্কৃতি থেকে। সবচেয়ে আগুনে স্কয়ার কাটের মালিক, যিনি এক পায়ে ডাবল সেঞ্চুরি, যাকে দেখলে মাথায় একটা কথাই প্রথমে মাথায় আসে – ‘আহত ব্যাটসম্যান থেকে সাবধান!’ সেই গ্রিনিজ জয়ের পর কাঁদলেন, এই জয়ের গরুত্বও এই দলটার কাছে ততটাই!’

সেমিতে স্কটল্যান্ডকে সহজেই হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। আজন্ম লালিত স্বপ্ন পূরণ হয় বাংলাদেশের অগণিত ক্রিকেটভক্তের।

ফাইনালে কেনিয়ার বিপক্ষে আরও এক দফা ইতিহাসের সাক্ষী হয় গোটা বাংলাদেশ। আরও একটি তুমুল নাটকীয়তায় ভরা ‘বৃষ্টিবিঘ্নিত’ ম্যাচে কেনিয়াকে ২ উইকেটে হারিয়ে স্বপ্নের আইসিসি ট্রফির শিরোপা ঘরে তোলে টাইগাররা।

একের পর এক স্নায়ুক্ষয়ী সেই মুহূর্তগুলো বাংলাদেশ সফলভাবে উতরাতে সমর্থ হয়েছিল কেবল গ্রিনিজের দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা আর অভিজ্ঞতার গুণেই। বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে অভিভাবক হিসেবে গ্রিনিজের মতো একজন ক্রিকেট ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি দলের চেহারাটাই বদলে দিয়েছিল। মাঠের বাইরে থেকে তিনি যেভাবে খেলোয়াড়দের মনে সাহস জোগাতেন, উৎসাহ দিতেন তা আজও অনেক ক্রিকেটারের স্মৃতিতে অম্লান। দলের প্রতিটা সদস্যকে নিজের সন্তানের মতই স্নেহ করতেন গর্ডন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাই মাঠ ও মাঠের বাইরে খেলোয়াড়দের সাথে তাঁর একটি আবেগময় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

আইসিসি ট্রফি জয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ গ্রিনিজকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হয় সম্মানসূচক নাগরিকত্ব। বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলীর পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া দ্বিতীয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব হলেন গর্ডন গ্রিনিজ। নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে গর্ডনকে দেওয়া হয়েছিল একটি পাসপোর্ট। গ্রিনিজ সেই পাসপোর্টটি সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।

’৯৭ আইসিসি ট্রফি জয়ের পর গ্রিনিজের অধীনেই বাংলাদেশ পেয়েছিল ওয়ানডে স্ট্যাটাস। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের আগে বেশ কয়েকটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলারও সুযোগ পেয়েছিল। ১৯৯৮ সালের মে মাসে তাঁর হাত ধরেই কেনিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ পেয়েছিল ওয়ানডে ইতিহাসে নিজেদের প্রথম জয়।

গ্রিনিজের অধীনে সাফল্য-ব্যর্থতা হাতে হাত মিলিয়েই এগিয়েছে। তবে তাঁর সময়ের ব্যর্থতাকে বড় করে দেখার সুযোগ খুব কমই। বরং এদেশের ক্রিকেটে সাফল্য আসার রাস্তাটা নির্মিত হয়েছিল তাঁর হাতেই। গ্রিনিজের সময়েই ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছিল বাংলাদেশ; মেহরাব হোসেন অপির ব্যাটে।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচটি ছিল নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে। সেবারই প্রথমবারের মতো কোন টেস্ট খেলুড়ে দলকে হারালাম আমরা। অথচ ঐতিহাসিক সেই ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে গ্রিনিজের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল বরখাস্তের নোটিশ! চাকরি হারানো গ্রিনিজ তবু সেদিন এসেছিলেন মাঠে; দেখা করে গিয়েছিলেন প্রাণপ্রিয় শিষ্যদের সঙ্গে। যে কিনা দলটার পেছনে জানপ্রাণ উজাড় করে দিল, এত বড় একটা বিজয় উদযাপিত হয়েছিল সেই মানুষটিকে ছাড়াই!

’৯৯ বিশ্বকাপের আগে থেকেই এদেশের ক্রিকেট প্রশাসকদের সঙ্গে কিছু ব্যাপারে গ্রিনিজের টানাপোড়েন চলছিল। বাংলাদেশ তখন টেস্ট স্ট্যাটাস পেতে ব্যাকুল। অথচ বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো ছিল অনুন্নত; আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট শুরুই হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে তাই টেস্ট মর্যাদার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন গর্ডন। গ্রিনিজের অভিমত ছিল, টেস্ট খেলার জন্য বাংলাদেশ এখনো তৈরি নয়। আর তাতেই ক্রিকেট বোর্ডের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরাগভাজন হন তিনি।

তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এমন একটা দিনে যার একদিন পরেই জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ব্যাপারটি লজ্জা দিয়েছিল সবাইকে। লজ্জার মাত্রাটা আরো বেড়ে গিয়েছিল, গর্ডন গ্রিনিজ বিশ্ব ক্রিকেটের একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব বলে। গর্ডন গ্রিনিজ যে মাপের ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব, তাঁকে এভাবে বিদায় করে দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটই অসম্মানিত হয়েছে।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলল, ভালো করল অথচ গ্রিনিজ বিদায় নিলেন নিরবে, নিভৃতে, মাথা হেঁট করে। এই ঘটনাটি জাতি হিসেবে আমাদের মাথা উঁচু তো করেইনি, বরং গর্ডনের সেই বিদায় জাতি হিসেবে আমাদের মাথা হেঁট করে দিয়েছিল।

বিদায়টা সুখকর না হলেও গ্রিনিজের মনে যে বাংলাদেশের জন্য একটা আলাদা জায়গা সবসময়ই ছিল, তার প্রমাণ মেলে ২০০০ সালে; বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেকের স্বর্ণালি লগ্নে। বিসিবির বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি সস্ত্রীক বাংলাদেশে এসেছিলেন বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই। সবকিছু ভুলে এদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবেই। অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশের দারুণ পারফরম্যান্স দেখে যারপরনাই খুশি হয়েছিলেন গ্রিনিজ। উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছিলেন, ‘I am very happy for Bangaldesh, my boys have done wonderfully well.’

অভিষেক টেস্টে শতক হাঁকানো প্রিয় শিষ্য আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে নিজের হোটেল রুমে ডেকে নিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন গ্রিনিজ। আর বলেছিলেন, ‘Well played my boy, but why did you get out? You should have kept your patience. After all it is not every day that you get a chance to make a real big score.’

গর্ডন গ্রিনিজকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিবেদিত প্রাণ বিদেশি কোচ বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। এদেশের ক্রিকেটের আজকের এই উত্থানের পেছনে গ্রিনিজের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলাদেশে কাটানো তিনটে বছর গ্রিনিজ কখনোই ভুলবেন না। শুধু ক্রিকেট নয়, এ দেশের মানুষের কাছে যে ভালোবাসা পেয়েছেন, সেটাও হয়ত কোনদিন ভুলবেন না গ্রিনিজ।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের কোচ হিসেবে দায়িত্বটা ছিল একই সাথে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং এবং উপভোগ্য। আমার সময়ে বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জিতেছে, যা তাদের বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশে আমার রয়েছে অসংখ্য স্মৃতি। আমরা সবাই মিলে যা যা অর্জন করেছিলাম, তার জন্য আমি আজও গর্ববোধ করি। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ আমার হৃদয়ের অনেকটা জায়গাজুড়েই আছে এবং চিরকাল থাকবে।’

বাংলাদেশের ক্রিকেটানুরাগী মানুষ গর্ডন গ্রিনিজকে কোনোদিনও ভুলবে না।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...