ক্রিকেটকে অনেকে বিজ্ঞান আর যুক্তির চোখ দিয়ে দেখতে চান। বিশেষত, বোলিং, সুইং, স্ট্রোক সবই যেন বিজ্ঞান ও ক্রিকেটীয় যুক্তির নিঁখুত কারিকুরি, যার সঠিক কম্বিনেশনে বল নিমিষেই পার হয়ে যায় সীমানা। তবু ক্রিকেটে কখনো কখনো বিজ্ঞান আর যুক্তি অসার হয়ে পড়ে অতিমানবীয় কিছু চরিত্রের বদৌলতে। গল্পটা তাদেরই মধ্যকার এক কিংবদন্তিকে নিয়ে, যাঁর ব্যাট সব প্রচলিত যুক্তিকে বারবার বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। তিনি বীরেন্দর শেবাগ।
প্রথাগত ক্রিকেট তত্ত্ব বলে, টেস্টে প্রতিপক্ষ প্রথমে ৪০০ রানের পাহাড় গড়লে রক্ষণাত্মকভাবে খেলতে হবে। কিন্তু শেবাগের অভিধানে ‘রক্ষণ’ শব্দটাই যেন অনুপস্থিত। মাত্র দুই সেশনেই ব্যক্তিগত ২৮৩ রান তুলে প্রতিপক্ষকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার অসীম ক্ষমতা শুধু তাঁরই আছে। যেন তাঁর ব্যাটিং সমর্থকদের ভাবনার চেয়েও দ্রুত। এক মুহূর্তের জন্য পলক ফেললে, আপনি হয়তো মিস করবেন তাঁর কোনো মহাকাব্যিক মাস্টারপিস।
১৯৭৮ সালে জন্মানো শেবাগের ক্রিকেট দর্শন ছিল যেন খানিকটা বৌদ্ধ জেন গুরুদের মতো: ব্যাট ধরো পুরোপুরি ভারমুক্ত হয়ে আর খেলে যাও পরিচ্ছন্নভাবে। একারণে তিনি এমসিসি কোচিং ম্যানুয়ালের ধার ধারতেন না। মাঠের যে কোণায় রান পাওয়ার কথা নয়, সেখান দিয়েই শেবাগ অবলীলায় বল পাঠাতেন সীমানার বাইরে।

বিশেষজ্ঞরা যখন পায়ের নড়াচড়ার তত্ত্ব নিয়ে ব্যস্ত, শেবাগ তখন ক্রিজে থিতু হয়েই সাজাতেন নিঁখুত সব ড্রাইভের পসরা। এমনকি এলবিডব্লিউর ফাঁদ এড়াতে প্রথাগত ব্যাকরণ মেনে পা সামনে না বাড়িয়ে জায়গায় দাঁড়িয়েই তিনি খেলতেন আগ্রাসী সব শট।
স্পিনারদের বিপক্ষে তাঁর ব্যাট চলত অসম্ভব গতিতে। মুত্তিয়া মুরালিধরন কিংবা শেন ওয়ার্ন, সবাইকে তিনি ক্রিজে আক্রমণ করেছেন সমান তালে। সাকলায়েন মুশতাককেও এতটুকু ছেড়ে কথা বলতেন না এই ভারতীয় টপ অর্ডার ব্যাটার। সুনীল গাভাস্কার আর তাঁর সমান ব্যাটিং গড় থাকলেও, স্ট্রাইক রেট প্রায় দ্বিগুণ ছিল শেবাগের। টেস্টে জোড়া ট্রিপল সেঞ্চুরি, বড় বড় সব সেঞ্চুরি-ডাবল সেঞ্চুরির ইনিংস আর ওয়ানডেতে ২১৯ রানের ঝকঝকে ক্যামিও—সবই যেন ছিল তাঁর রূপকথার মতো ক্যারিয়ারের আলোকিত অংশ।
যেন বিজ্ঞান ও যুক্তি পরাস্ত হয়েছে শেবাগের ব্যাটের কাছে। ক্রিকেটের এক অবিনশ্বর বিস্ময় হয়েই দর্শকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় আজীবন ঠাঁই পাবেন এই ডানহাতি কিংবদন্তি ভারতীয় ব্যাটার।











