লিওনেল মেসি, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই যিনি বিস্ময় ছড়িয়েছেন। ফুটবলের ধুধু মরুভূমিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছেন। তবে সবার অলক্ষ্যে আরও একটা জিনিস করে গেছেন, দলের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে বদলে নেওয়া। এই অ্যাডাপ্টিবিলিটিই মেসিকে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরিয়ে দিয়েছে, গায়ে চাপিয়ে দিয়েছে রাজপোশাক।
ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন আউট-অ্যান্ড-আউট উইঙ্গার হিসেবে। তখন তাঁর প্রধান কাজ ছিল গোল করানো। এরপর এল পেপ গার্দিওলার বিপ্লব। মাঝমাঠ আর আক্রমণের মাঝের সেই অচেনা জায়গায় তাঁকে দাঁড় করিয়ে বানিয়ে দিলেন ‘ফলস নাইন’। হঠাৎ করেই দায়িত্ব বদলে গেল। সবচেয়ে বড় কাজ হয়ে দাঁড়াল গোল করা। এরপর আবার এনরিকে তাঁকে পাঠিয়ে দিলেন উইংয়ে। তবে আগের মতো নয়। এবার তিনি একসঙ্গে গোলও করেন, করানও।
সময় গড়াল, বয়স বাড়ল, গতি কিছুটা কমল। ২০১৮-১৯ মৌসুমে তিনি আরও একবার নিজেকে বদলে নিলেন। হয়ে উঠলেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। এবার তাঁর দায়িত্বে যোগ হলো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের ছন্দ তৈরি, কখন খেলাটা দ্রুত হবে আর কখন ধীরগতির হবে, এর সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ। এরপর ২০২২ নাগাদ সেকেন্ডারি স্ট্রাইকার। অর্থাৎ, নিজের ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে নতুন নতুন ভূমিকায় নিজেকে গড়ে তুলেছেন লিওনেল মেসি। আগেরটা সঙ্গে রেখেই ঘাড়ে নিয়েছেন একের পর এক ভার। মেসি বলেই হয়তো পেরেছেন।
একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারে পজিশন বদলানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু প্রতিবার নতুন পজিশনে গিয়ে বিশ্বের সেরাদের একজন হয়ে ওঠা? সেটাই মেসিকে আলাদা করে। অনেকেই মনে করেন, মেসির সবচেয়ে বড় গুণ তাঁর ড্রিবলিং, পাসিং কিংবা ফিনিশিং। অথচ সবচেয়ে অবমূল্যায়িত গুণটি সম্ভবত তাঁর পজিশনাল অ্যাডাপ্টিবিলিটি। দলের যা প্রয়োজন, তিনি ঠিক সেটাই হয়ে উঠেছেন।

এই বিশ্বকাপ সেই সত্যিটাকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বিশ্বকাপে খেলছেন সেকেন্ড স্ট্রাইকার হিসেবে। তবে ওটা শুধুই পজিশনের নাম। আসলে মেসি আছেন সর্বত্র। মিশরের বিপক্ষে যখন আর্জেন্টিনা দিশেহারা, তখন রাইট উইংয়ে চলে গেলেন। এরপর গোল করানোর সেই রোলটা আরও একবার সামনে এল। বুঝে গিয়েছিলেন, তাকেই কিছু একটা করতে হবে। সেটাই করেছেন বটে।
ইংল্যান্ড ম্যাচেও অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিলেন। নিকো গঞ্জালেস নেমে যখন লেফট উইংয়ের হাল ধরলেন, ওমনি মেসি চলে গেলেন রাইট উইংয়ে। তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন, ভাবা যায়? ৩৯ বছরের রাইট উইঙ্গার তিনি! শুধু নামে না, কাজের কাজটাও যে করেছেন ওখান থেকেই। বুঝিয়ে দিলেন, দলের দরকারে তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।
গ্রুপ পর্বে তাঁকে দেখা গেছে গোলস্কোরারের ভূমিকায়। কিন্তু নকআউটে সেই মেসিই হয়ে গেলেন ক্রিয়েটর। তিনি জানেন, ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের চেয়ে দলের জয় অনেক বড়। নিজের গোলের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে সতীর্থের জন্য সুযোগ তৈরি করাটাই যদি দলের উপকারে আসে, তবে সেটাই করবেন।
ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তিই তো এসেছেন। কেউ দুর্দান্ত গোলস্কোরার, কেউ প্লেমেকার, কেউ বা বিধ্বংসী উইঙ্গার। কিন্তু একই ক্যারিয়ারে আউট-অ্যান্ড-আউট উইঙ্গার, ফলস নাইন, রাইট উইং, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, সেকেন্ডারি স্ট্রাইকার প্রায় প্রতিটি আক্রমণাত্মক ভূমিকায় বিশ্বের সেরাদের একজন হয়ে থাকা, এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন।

হয়তো এ কারণেই লিওনেল মেসি ফুটবল-সমাধান। কোচের প্রয়োজন বদলেছে, কৌশল বদলেছে, বয়স বদলেছে, শরীর বদলেছে কিন্তু বদলায়নি তাঁর প্রভাব, নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষমতা। তাই তো দুই দশক আগে আর পরের ব্যবধান অনেক হলেও সেরার আসনে বসে থাকা একচ্ছত্র সম্রাটের নাম কিন্তু লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।










