১৯৬৬ সালের বসন্ত। ফুটবলের মহাযজ্ঞ শুরু হতে বাকি আর মাত্র চার মাস। সারা বিশ্বের চোখ তখন লন্ডনের দিকে। কিন্তু হঠাৎ এক বজ্রপাতে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল ফুটবল দুনিয়া। চুরি হয়ে গেল পরম আরাধ্য ‘জুলে রিমে’ ট্রফি!
১৯৬৬ সালের ২০ শে মার্চ। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে একটি স্ট্যাম্প প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল বিশ্বকাপের মূল ট্রফিটি। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও, রক্ষীদের বিরতির সুযোগে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে প্রদর্শনীর কাঁচ ভেঙে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। তৎকালীন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং পুলিশ প্রশাসনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
তদন্ত শুরু করে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। এর মধ্যেই এফএ চেয়ারম্যান জো মিয়ার্সের কাছে একটি উড়ো চিঠি আসে। ১৫,০০০ পাউন্ড মুক্তিপণ দাবি করে ‘জ্যাকসন’ নামের এক ব্যক্তি। পুলিশি পরামর্শে মিয়ার্স সেই চুক্তিতে রাজি হওয়ার ভান করেন।

কিন্তু আসল টাকার বদলে খবরের কাগজের বান্ডিল দিয়ে সাজানো একটি স্যুটকেস নিয়ে ধরা হয় সেই ব্যক্তিকে। ধৃত ব্যক্তির আসল পরিচয় ছিল এডওয়ার্ড বেচলে – একজন প্রাক্তন সৈনিক। কিন্তু তাকে ধরা সম্ভব হলেও ট্রফিটি কোথায় আছে, তা তার মুখ থেকে বের করা সম্ভব হয়নি।
২৭ শে মার্চ। ট্রফি নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন কেটে গেছে। দক্ষিণ লন্ডনের নরউডের বাসিন্দা ডেভিড করবেট তার আদরের কুকুর পিকলসকে নিয়ে বিকেলে হাঁটতে বের হয়েছিলেন। প্রতিবেশী একটি গাড়ির পাশে পিকলস হঠাৎ মাটির ওপর পড়ে থাকা একটি বস্তুর ঘ্রাণ নিতে শুরু করে।
মাটিতে পড়ে ছিল খবরের কাগজে মোড়ানো এক রহস্যময় প্যাকেট। করবেট ভাবলেন কোনো বোমা নয় তো? কিন্তু কাগজ ছিঁড়তেই বেরিয়ে এল এক অভাবনীয় দৃশ্য। সোনার পাতে খোদাই করা – ব্রাজিল, জার্মানি আর উরুগুয়ে। করবেটের চোখে তখন বিস্ময়। পিকলস খুঁজে পেয়েছে ফুটবল বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া মুকুট!

রাতারাতি সেলিব্রিটি বনে গেল পিকলস। খবরের শিরোনামে শুধুই তার নাম। টিভিতে অভিনয়, মেডেল আর অঢেল পুরস্কারে সিক্ত হলো সে। ফাইনাল ম্যাচে ইংল্যান্ড যখন চ্যাম্পিয়ন হলো, সেই রাতে পিকলস ছিল বিশেষ অতিথি। লন্ডনের ব্যালকনিতে কিংবদন্তি ববি মুর তাকে কোলে তুলে ধরলেন। হাজারো মানুষ যেন বিশ্বকাপ জয়ের চেয়েও বেশি উল্লাস করল এই চতুষ্পদ বীরের জন্য।
পিকলসের জীবন ছিল স্বল্প দৈর্ঘ্যের এক মহাকাব্য। ১৯৬৭ সালে এক তুচ্ছ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। বর্তমানে সারের লিংফিল্ডে শান্ত এক বাগানে সে চিরনিদ্রায় শায়িত।
অদ্ভুত এক সত্য হলো, সেই আসল ট্রফিটি ১৯৮৩ সালে ব্রাজিল থেকে আবারও চুরি হয়। যা আর কোনোদিন ফেরেনি। পৃথিবীর বুক থেকে মূল জুলে রিমে ট্রফি চিরতরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে পিকলসের নাম। ফুটবল যতকাল থাকবে, এই ধূর্ত আর অনুগত বন্ধুটির গল্প ততকাল মানুষের মনে অনুরণন তুলবে।












