১৪৩ বছরের ইতিহাস ও তেত্রিশ বছরের নীরবতা চূর্ণ শরিফুলের হাতে!

ম্যাকায়ের সকালটা তাই শুধু একটা ইনিংস গুটিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। ২১০ রানে অলআউট হওয়া অস্ট্রেলিয়ার স্কোরকার্ডের পেছনে লুকিয়ে আছে একটা প্রশ্ন- ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে ইনসুইং আর গুড লেংথ থেকে বল তুলে আনার যে দক্ষতা শরিফুলের চেনা অস্ত্র, সেটা যে একদিন গোটা একটা শতাব্দীর রেকর্ড বই উল্টে দেবে, তা কি সত্যিই কেউ ভেবেছিল?

ম্যাকায়ের আকাশটা তখনও কুয়াশা কাটিয়ে পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ঠিক তখনই বল হাতে দৌড় শুরু করলেন এক বাঁহাতি তরুণ, আর তার পরের কিছুক্ষনে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ যেন মিশে গেল ধুলোয়। শরিফুল ইসলাম নামটা রোববার সকালে শুধু স্কোরবোর্ডে ওঠেনি, উঠে গেছে ইতিহাসের পাতায়, সেই পাতায় যেখানে সময় মেপেছে দশক নয়, শতাব্দী।

১৫ ওভারের এক দীর্ঘ যুদ্ধে ৪৮ রানে ৭ উইকেট- সংখ্যাগুলো ছোট, কিন্তু ওজনে পাহাড়সম। কেননা এই ২১ শতকে, ঠিক বলতে গেলে ১৯৯৩ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো পেসারের এত ভালো বোলিং স্পেল দেখা যায়নি। শেষবার এমন ঝড় তুলেছিলেন ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি কার্টলি অ্যামব্রোজ, পার্থের ওয়াকায় ২৫ রানে ৭ উইকেট নিয়ে। তেত্রিশ বছরের সেই নীরবতা ভাঙলেন বাংলাদেশের শরিফুল।

আর বাঁহাতি পেসারদের হিসেবে গল্পটা আরও পুরনো, আরও রোমাঞ্চকর। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফরকারী কোনো বাঁহাতি পেসারের সবশেষ ৭ উইকেটের কীর্তি ছিল ১৮৮৩ সালে, রিচার্ড বার্লোর হাত ধরে। তার আগে ১৮৭৯ সালে একই কাজ করেছিলেন টম এমেট। মাঝে পুরো বিংশ শতাব্দী কেটে গেছে, অথচ কোনো সফরকারী বাঁহাতি পেসার এই কীর্তি ছুঁতে পারেননি। ১৪৩ বছরের সেই খরা শেষ করলেন ২৫ বছর বয়সী শরিফুল, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এই কৃতিত্বে তিনি এখন সব মিলিয়ে সপ্তম বাঁহাতি পেসার- যেখানে চারজনই আবার স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব সন্তান: মাইক হুইটনি, ব্রুস রেইড, মিশেল জনসন আর মিশেল স্টার্ক।

দিনের শুরুটাও হয়েছিল নাটকীয়তা দিয়ে। ক্যামেরুন গ্রিনকে ফেরাতে শরিফুল বেছে নিলেন নিখুঁত এক ইয়র্কার, বল আছড়ে পড়ল পায়ের পাতার একদম আগায়। খালি চোখে আউট মনে হলেও আম্পায়ার প্রথমে সাড়া দেননি, রিভিউয়ে গিয়ে সত্যিটা বেরিয়ে আসে। সেই এক বলেই সপ্তম উইকেট পূর্ণ হয় শরিফুলের, আর তাতেই লেখা হয়ে যায় নতুন এক অধ্যায়।

সংখ্যার হিসেবে শরিফুলের ওপরে আছেন কেবল একজনই- অনিল কুম্বলে। ২০০৪ সালে সিডনিতে ১৪১ রানে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন ভারতীয় লেগস্পিনার। রানের হিসেবে মিতব্যয়িতায় আর আক্রমণের তীব্রতায় শরিফুলের ৭ উইকেটে ৪৮ রান-কেই ধরা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফরকারী বোলারদের সেরা পারফরম্যান্স, যা ছাড়িয়ে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের শামার জোসেফের ২০২৪ সালের সেই আলোচিত ৭ উইকেটে ৬৮-কেও। ক্যারিবিয়ান সেই তারকাকে পেছনে ফেললেন বাংলাদেশের এক তরুণ বাঁহাতি- এই একটি বাক্যই বলে দেয় কতটা পথ পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও শরিফুলের নাম এখন আলাদা ফ্রেমে বাঁধানো। দেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্টের এক ইনিংসে ৭ উইকেট নিলেন তিনি। এতদিন পেসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬ উইকেটের কীর্তি ছিল শাহাদাত হোসেন, এবাদত হোসেন, হাসান মাহমুদ, মঞ্জুরুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ আর রবিউল ইসলামের- শাহাদাত ছাড়া বাকি সবাই সেটা করেছিলেন দেশের বাইরে। শরিফুল সেই তালিকাকে ছাড়িয়ে গেলেন এক লাফে।

দেশের বাইরে সাত কিংবা তার বেশি উইকেটের কীর্তি এর আগে ছিল কেবল তাইজুল ইসলামের- গত জুনে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৩৮ রানে ৭ উইকেট। আর দেশ-বিদেশ মিলিয়ে টেস্টে ৭ উইকেটের মালিক হিসেবে শরিফুল বাংলাদেশের পঞ্চম বোলার, তার আগের চারজনই ছিলেন স্পিনার- তাইজুল (তিনবার), সাকিব আল হাসান, এনামুল হক জুনিয়র আর মেহেদী হাসান মিরাজ।

ম্যাকায়ের সকালটা তাই শুধু একটা ইনিংস গুটিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। ২১০ রানে অলআউট হওয়া অস্ট্রেলিয়ার স্কোরকার্ডের পেছনে লুকিয়ে আছে একটা প্রশ্ন- ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে ইনসুইং আর গুড লেংথ থেকে বল তুলে আনার যে দক্ষতা শরিফুলের চেনা অস্ত্র, সেটা যে একদিন গোটা একটা শতাব্দীর রেকর্ড বই উল্টে দেবে, তা কি সত্যিই কেউ ভেবেছিল?

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link