অভিষেক শর্মার বাবা রাজকুমার শর্মা নাকি রীতিমতো বিরক্ত হয়ে যেতেন। ছেলে অনুশীলনে শুধু মারতে চাইত। তখন সে রীতিমত কিশোর। একদিন তো এতটাই ক্ষেপে গিয়েছিলেন যে টানা দু’দিন ব্যাট ধরতেও দেননি। কিন্তু অভিষেক কাঁধ নাড়িয়ে আব্বার ছক্কা হাকানোর প্রস্তুতি নিতেন।
রাজকুমারের মতই দিল্লীতে বিরক্ত হতেন সঞ্জয় ভারতদ্বাজ। তিনি ছিলেন গৌতম গম্ভীর, অমিত মিশ্র, জোগিন্দর শর্মা, উন্মুক্ত চাঁদের মতো প্রতিভাবানদের কোচ। তাঁকেও নতুন প্রজন্মের ব্যাটার প্রিয়ানশ আরিয়ার কারণে পদ্ধতি বদলাতে হয়েছে। প্রিয়ানশের ব্যাটিং দেখেই তিনি বুঝলেন, এই ছেলেটিকে খোলসবন্দী রাখলে কোনো লাভ নেই; বরং তাকে মুক্ত আকাশে উড়তে দিতে হবে। ছক্কা হাকাতে বাঁধা দেওয়া যাবে না।
ফলাফল ২০২৫ সালের আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে মাত্র ৩৯ বলে সেঞ্চুরি করে বললেন পাঞ্জাব কিংসের আরিয়া। আজকের মারকাটারি ক্রিকেটের যুগে ছক্কা মারাটাই বাড়তি একটা ইউএসপি। একসময় কোচরা বারবার বলতেন—‘সোজাসুজি খেলো, ভি-এর মধ্যে শট মারো’। ছক্কা মারার চেষ্টা করলে শাসন জুটত। কিন্তু, টি-টোয়েন্টি সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। এখন ব্যাটার হতে হলে মাঠের গ্যালারির দিকে তাকিয়েই খেলতে হয়, ঝুঁকি নিতে হয়, আক্রমণ করতে হয়।

টি-টোয়েন্টির প্রথম দিকটা ছিল ওয়ানডের মতো: শুরুতে ঝড়, মাঝখানে উইকেট বাঁচানো, শেষে ধুন্ধুমার আক্রমণ, চোখ বন্ধ করে বলকে পেটানো। কিন্তু দুই দশকে ফরম্যাটটি নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে। এখন ব্যাটিং মানে দ্রুত রান তোলা, স্ট্রাইক রেট বাড়ানো, উইকেট বাঁচানো নয়। বিশ্লেষণ, ডেটা, ম্যাচ অভিজ্ঞতা—সব দেখিয়েছে, ধীরগতির রান তোলার চেয়ে ঝুঁকি নিয়ে আক্রমণ চালানো অনেক কার্যকর। ফলে মিডল অর্ডার এখন শক্তিশালী হিটারদের দখলে।
স্বয়ং পরিসংখ্যান এখানে ছক্কার হয়ে কথা বলে। ২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়া আটটি টি-টোয়েন্টিতে মেরেছে ৯২ টি ছক্কা—গড়ে প্রতি ৯.৫ বলে একটি। ২০২৩ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৩ ম্যাচে মেরেছিল ১৫৭ টি, প্রতি ৯.২ বলে একটা করে।
২০১২ সালে যেখানে ২৭ বলে একবার ছক্কা দেখা যেত, আজ তা অর্ধেকেরও কম। ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম দল যারা এই সমীকরণটা বুঝেছিল। ২০১৬ বিশ্বকাপজয়ী দল শীর্ষ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রতি ১৬.৩ বলে ছক্কা মেরেছিল, অন্যরা তখনও ২২–২৩ বলে। ভারতীয় হল ২০১৫ সালে প্রতি ৪২ বলে একবার ছক্কা হাকাত, ২০২০-র দিকে নেমে ১৮.১-এ আসল। ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী ভারত ২৬ ম্যাচে প্রতি ১২.১ বলে একবার করে ছক্কা হাঁকাল।

আইপিএলই পরিবর্তনের সবচেয়ে পরিষ্কার ছবি এঁকে দিয়েছে। ২০২১ মৌসুমে ১৩,৯৫২ বল খেলে ৬৮৭টি ছক্কা দেখেছিল ক্রিকেট, প্রতি ২০.৩ বলে একটা করে ছক্কা। চার বছর পরে, ২০২৫-এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১,২৯৪-এ, প্রতি ১২.৭৬ বলে একটা করে। এই যুগের ক্রিকেটাররা অন্যরকম। অভিষেক শর্মা, সুরিয়াকুমার যাদব কিংবা টিম ডেভিডরা শুধু রান তোলেন না; প্রতিটি বল থেকে সর্বোচ্চটা আদায় করার মানসিকতা নিয়ে নামেন। হিসাবটা সহজ: ১২০ বল, ১০ উইকেট, যতটা সম্ভব আক্রমণ করে যাও।
টি-টোয়েন্টি আর কেবলই ওয়ানডের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ নয়। ফরম্যাটের মূল শিরায় গেঁথে আছে ঝুঁকি, ব্যাটারদের আক্রমণাত্মক মনোভাব আর ছক্কার উন্মাদনা। স্কোর বাড়বে, বোলারদের অবস্থান চলে যাবে প্রান্তিক পর্যায়ে। তাতে, বোলারদের সম্মানহানি যতই হোক, ক্রিকেটের বিনোদন ততই বাড়বে।










