ক্রিকেটের বাইশ গজে কিছু প্রতিভা আসে ধূমকেতুর মতো, যারা মুহূর্তেই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। কিন্তু সেই আলো ধরে রেখে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে ওঠা সবার ভাগ্যে জোটে না। সাঞ্জু স্যামসন সেই বিরল ক্রিকেটারদের একজন, যাঁর ব্যাটের প্রতিটি শট যেন ক্যানভাসে আঁকা নিখুঁত কোনো জলছবি। আজ যখন তিনি সাফল্যের শিখরে, তখন ফিরে তাকালে দেখা যায় এক কিশোরের লড়াই আর দীর্ঘ অপেক্ষার মহাকাব্য।
গল্পের শুরুটা আজ থেকে বছর পনেরো আগে। কেরালার এক ট্রায়ালে পনেরো বছর বয়সী এক কিশোরের ব্যাটের ধার দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন কলকাতার বর্তমান ফিল্ডিং কোচ বিজু জর্জ। মুগ্ধ বিজু দেরি না করে তৎকালীন কেকেআর ডাইরেক্টর জয় ভট্টাচার্যকে ফোনে বলেছিলেন, ‘এই ছেলেটিকে তোমার দেখতেই হবে।’ জয়ের জহুরির চোখও ভুল করেনি, স্কাউটিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাঞ্জু পেয়ে গেলেন প্রথম আইপিএল চুক্তি। যদিও আসর শেষেই সাঞ্জুকে বাদ দিয়ে দেয় কলকাতা।
তবে স্রষ্টা বোধহয় সাঞ্জুর জন্য আরও বড় কিছু লিখে রেখেছিলেন। রাহুল দ্রাবিড়ের প্রখর ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তা ততদিনে সাঞ্জুকে চিনে নিয়েছিল। রাজস্থান রয়্যালসে দ্রাবিড়ের হাত ধরেই ২০১৩ সালে আইপিএল অভিষেক হয় তার। দ্রাবিড় ও সাঞ্জুর এই রসায়ন এতটাই গভীর ছিল যে, রাজস্থান সাসপেন্ড হওয়ার পর দ্রাবিড় যখন দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের কোচে হলেন, সেখানেও নিয়ে গেলেন তাকে।

মাঝখানে অনেকটা সময় কেটেছে দোলাচলে। ২০১৪ সালে ভারতের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেললেও আইপিএলে সেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারছিলেন না সাঞ্জু। বিষণ্ণতা আর মানসিক চাপ যেন এই অনন্য প্রতিভাকে গ্রাস করার উপক্রম ছিল। অথচ স্পিন আর পেসের বিরুদ্ধে তার মতো কমপ্লিট গেম আধুনিক ভারতীয় ক্রিকেটে লোকেশ রাহুলের পর খুব কম ব্যাটসম্যানেরই আছে।
অন্যদিকে রাজস্থান রয়্যালস আইপিএলে ফিরলে আবারও দলে ফেরেন সাঞ্জু। সেই ২০১৮ থেকে ২০২৫ অবধি – সাঞ্জু ছিলেন রাজস্থানের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ যখন আমরা সাঞ্জুর সুসময় দেখছি, তখন পর্দার আড়ালে থাকা সেই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কথা ভুলে গেলে চলবে না।
অভিষেক শর্মা থেকে সাঞ্জু স্যামসন। এই নামগুলো আজ কেবল স্কোরবোর্ডের পরিসংখ্যান নয়, বরং এক একটি সফল স্বপ্ন। সত্য এটাই যে, আইপিএল নামক এক মঞ্চ না থাকলে কেরালার সেই পনেরো বছরের কিশোরটি হয়তো হারিয়ে যেত বিস্মৃতির অতলে।

গ্যালারির উল্লাস আর আলোঝলমলে মঞ্চের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শান্ত দ্রাবিড় বা দূরদর্শী বিজু জর্জরা হয়তো আজ আড়ালে হেসেই তৃপ্ত। কারণ তাঁরা জানতেন, জহুরির চোখে ধরা পড়া সেই হিরেটি একদিন ঠিকই নিজের দ্যুতিতে আকাশ রাঙাবে।










