সেলেসাওদের চব্বিশ বছরের অমানিশা

উত্তর আমেরিকার মাঠে এবার সেলেসাওদের সামনে কেবল দুটি পথ। হয় ষষ্ঠ ট্রফির সোনালী গৌরব ছোঁয়া, না হয় নিজেদের ইতিহাসে দীর্ঘতম শিরোপাহীন বন্ধ্যাত্বের লজ্জাজনক রেকর্ড গড়া।

আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপ ব্রাজিলের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে এক নির্মম বাস্তবতাকে। উত্তর আমেরিকার মাঠে এবার সেলেসাওদের সামনে কেবল দুটি পথ। হয় ষষ্ঠ ট্রফির সোনালী গৌরব ছোঁয়া, না হয় নিজেদের ইতিহাসে দীর্ঘতম শিরোপাহীন বন্ধ্যাত্বের লজ্জাজনক রেকর্ড গড়া।

​ব্রাজিলীয় ফুটবলের মূল শক্তি ছিল তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। যাকে বলা হতো ‘জোগো বোনিতো’ বা সুন্দরতম খেলা। কিন্তু ১৯৯৫ সালের বোসম্যান আইনের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। লাতিন জাদুর খনি থেকে কাঁচা হীরেগুলো খুব অল্প বয়সেই পাড়ি জমাতে শুরু করে ইউরোপের ধনী ক্লাবগুলোতে। ফলে, ব্রাজিলের নিজস্ব ফুটবল সংস্কৃতির আত্মিক শক্তি এবং ঘরোয়া লিগের মান দুই-ই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

২০০৬ সালের তারকাখচিত দলটির ছন্দহীন বিদায়ের পর, ব্রাজিলীয় ফুটবল বোর্ড এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সাম্বার সহজাত ছন্দ ও স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরে দলে ‘যান্ত্রিক শৃঙ্খলা’ ও শারীরিক ফুটবল চাপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু যান্ত্রিক শৃঙ্খলা দিয়ে লাতিন সাম্বার প্রাণভোমরা ফিরিয়ে আনা যায় না। ২০১০ বিশ্বকাপে ডাচদের কাছে হার দিয়ে শেষ হয় সেই নিরানন্দ অধ্যায়।

আদ্রিয়ানো, কাকা বা রোনালদিনহোরা চোট আর মাঠের বাইরের অনিয়ন্ত্রিত জীবনে দ্রুতই হারিয়ে যান। ফলে, পরবর্তী সুপারস্টার নেইমারের কাঁধে এসে পড়ে এক বিশাল ও একাকী দায়িত্বের বোঝা। তাকে পথ দেখানোর মতো মাঠে কোনো অভিজ্ঞ মেন্টর ছিল না। দল হয়ে ওঠে পুরোপুরি ‘নেইমারনির্ভর’।

২০১৪ বিশ্বকাপে নেইমারের চোটের সুযোগে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক বিপর্যয় ছিল এই একক নির্ভরতারই চরম ট্র্যাজেডি। চোট আর ফর্মের দোলাচলে নেইমার নিজেও কখনো অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের চূড়া স্পর্শ করতে পারেননি, যার খেসারত দিতে হয়েছে ২০১৮ ও ২০২২ আসরে।

ব্রাজিলীয় কোচদের পুরনো কৌশল ইউরোপীয় আধুনিক ফুটবলের গতির সামনে বারবার পরাস্ত হয়েছে। ১৯৯৪ সালের পর থেকে বড় মঞ্চে তাদের পথচলা মূলত শেষ আটের বাধায় আটকে যাওয়ার গল্প। এই বৃত্ত ভাঙতেই ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে তারা বেছে নিয়েছে এক অভাবনীয় পথ। ইতিহাসের প্রথম বিদেশী কোচ হিসেবে ডাগআউটে আনা হয়েছে কার্লো আনচেলত্তিকে, যা ব্রাজিলের নিজস্ব কোচিং দর্শনের দেউলিয়াত্বকেই প্রমাণ করে।

​আজ পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা আর টুর্নামেন্টের অবধারিত ফেভারিট নয়। মহাকালের এই দীর্ঘ অপেক্ষা এখন ব্রাজিলের কাঁধে এক সীসাঢালা ওজন। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মাঠই ঠিক করবে – এই ২৪ বছরের খরা কি ঘুচবে, নাকি সাম্বার দেশ হারিয়ে যাবে এক অনন্ত হাহাকারে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link