নীল চোখের বেয়ারস্টো ও ‘হাসির শেষে নীরবতা’

ক্রিকেটার হিসেবে খুব প্রতিভাবান কেউ ছিলেন না। কিন্তু অসম্ভব দৃঢ়তা আর পরিশ্রমের বদৌলতে ইয়র্কশায়ারের হয়ে প্রায় দুই দশক ধরে ছিলেন স্টাম্পের পেছনকার অতন্দ্র প্রহরী। ফিল ক্যারিক তার সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘ও খুব ভাল উইকেটরক্ষক ছিল না, ছিল না খুব ভাল ব্যাটসম্যানও। তবে, ও খুব গ্রেট একজন ক্রিকেটার ছিল।’

স্বর্ণকেশ আর নীল চোখের জন্য তাকে সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করা যেত। আলাদা করা যেত তাঁর প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্যেও। ইয়র্কশায়ারের দর্শকদের কাছে ছিলেন দারুণ জনপ্রিয়, সতীর্থদের কাছেও এর ব্যতিক্রম নয়।

ক্রিকেটার হিসেবে খুব প্রতিভাবান কেউ ছিলেন না। কিন্তু অসম্ভব দৃঢ়তা আর পরিশ্রমের বদৌলতে ইয়র্কশায়ারের হয়ে প্রায় দুই দশক ধরে ছিলেন স্টাম্পের পেছনকার অতন্দ্র প্রহরী। ফিল ক্যারিক তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘ও খুব ভাল উইকেটরক্ষক ছিল না, ছিল না খুব ভাল ব্যাটসম্যানও। তবে, ও খুব গ্রেট একজন ক্রিকেটার ছিল।’

মানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও বিশ্বস্ত। স্যার জেফ্রি বয়কট তার ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘ও এমন মানুষ, যাকে তুমি অন্ধকার কোনো সরু গলি পার হয়ে যাবার সময় পাশে চাইবে।’

সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছল ছিলেন তিনি। ইয়র্কশায়ারের ড্রেসিংরুমে সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। স্যার লেন হাটন তো বললেনই, ‘ইয়র্কশায়ারের ড্রেসিংরুমে ওর থেকে বেশি আনন্দ কেউ দেয়নি আমাকে।’

এরপরই বলতে হচ্ছে অপ্রিয় সত্য কথাটি। যাকে নিয়ে কথা বলছি, ইংল্যান্ডের হয়ে ২১ ওয়ানডে ও ৪ টেস্ট খেলা সেই ডেভিড বেয়ারস্টো মাত্র ৪৬ বছর বয়সে বেছে নেন আত্মহননের পথ। জানুয়ারি মাসের এক শীতের রাতে স্ত্রী জ্যানেট, ছেলে জোনাথন ও মেয়ে বেকি বাসায় ফিরে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় আবিষ্কার করে ডেভিড বেয়ারস্টোকে।

জোনাথনের বয়স তখন আট। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না কী হয়েছে। সে কখনোই তাঁর বাবাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় দেখেনি। এক মুহূর্তের জন্যও তার কাছে মনে হয়নি যে কিছু গড়বড় আছে। একবারের জন্যেও তার মনে হয়নি যে তার বাবা তাদের একা রেখে দূর আকাশের তারা হতে যাচ্ছেন।

সকালবেলা বাবাকে বিদায় জানিয়ে বেকি ও জোনাথন স্কুলে চলে গিয়েছিল। বড়দিনের ছুটি শেষ হলো কেবল। বিকেলে তাদের মা জোনাথনকে লিডস ইউনাইটেডের অনুশীলনে নিয়ে গেল। বেকিও সাথে ছিল। ততক্ষণে তাঁদের ঘুণাক্ষরেও ধারণা ছিল না যে আর কয়েক ঘন্টার মাঝে তার জীবন ওলট-পালট হয়ে যাবে।

ডেভিড বেয়ারস্টো মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানোর দায়ে জেলেও গিয়েছিলেন তিনি৷ দুর্ঘটনার সময় ছেলে জোনাথন তাঁর সাথেই ছিল। ভেতরে ভেতরে ধৈর্য্যচ্যুত হচ্ছিলেন এই ভেবে, ছেলেটার যদি কিছু হয়ে যেত!

তার উপরে তিনমাস আগেই স্ত্রী জ্যানেটের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নিয়েছেন জ্যানেট, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চুল পড়ে গিয়েছে। পরচুলা পরে থাকতেন জ্যানেট। জোনাথন পরবর্তীতে জানতে পারেন যে, ডাক্তাররা জ্যানেটের স্বাস্থ্যের চাইতে ডেভিডের মানসিক অবস্থা নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন।

ডেভিড ভয় পেতেন, প্রচণ্ড ভয়৷ জ্যানেট যদি মারা যান! নিজেকে কীভাবে সামলাবেন, দুটো সন্তানকে কীভাবে স্বান্তনা দেবেন। প্রচণ্ড মানসিক অবসাদ আর পীড়ন তার স্বাস্থ্যের উপরেও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। একই সময়ে মনোবিদ ও চিকিৎসকের পরামর্শও নিতেন তিনি।

কিন্তু, ততদিনে নিজেকে সামলানোর ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন ডেভিড। তার মৃতদেহ যিনি পরীক্ষা করেছিলেন, তার মতে ডেভিড মারা যাওয়ার আগে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে চেষ্টা করছিল। হয়তো এই আশায় যে, জ্যানেট, বেকি আর জোনাথন এসে তাকে বাঁচিয়ে নেবে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! রাত আটটায় বাসায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও কেন যেন আধঘন্টা দেরি করে ফিরলেন জ্যানেট ও তার ছেলেমেয়ে৷ ততক্ষণে যে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।

ডেভিড যেদিন মারা যান, তার পরদিন ছিল তাঁর স্ত্রী জ্যানেটের ৪২ তম জন্মদিন। আত্মহত্যা করার কয়েক ঘন্টা আগেই শহরে গিয়ে তাদের দু’জনের জন্য একটা রেস্টুরেন্টে পরদিন ডিনার করার বন্দোবস্ত করে এসেছিলেন ডেভিড।

ছোট্ট জোনাথন মেলাতে পারেনি, ঠিক কেন এই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন ডেভিড। উত্তর খুঁজতে গিয়ে কোথাও না কোথাও এসে আটকে গিয়েছেন। হয়তো মানসিক স্বাস্থ্যের এতটাই অবনতি হয়ে গিয়েছিল যে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।

প্রথমটায় জোনাথনের খুব রাগ হতো। অথৈ সাগরে তাদের ফেলে দিয়ে কী করে যেতে পারলেন তার বাবা! কিন্তু সেই রাগটা ছিল অল্প সময়ের৷ নিজেকে নিজে বুঝিয়েছিল যে, তার বাবা হয়তো সহ্যসীমা পার করে গিয়েছিলেন আর এটা ছাড়া তার উপায় ছিল না।

আট বছরের বালক জোনাথনের জন্য অনেক বড় ধাক্কা ছিল বাবার মৃত্যু। এদিকে মা অসুস্থ। অজান্তেই অল্পবয়সে শোক সহ্য করার ক্ষমতা গড়ে উঠেছিল তার। নিজেই নিজেকে কথা দিয়েছিল, কখনো ভেঙে পড়া যাবেনা, কাঁদা যাবেনা।

সেই ঘটনার পর নয় বছর পেরিয়ে গেছে৷ ফুটবল ছেড়ে ততদিনে ক্রিকেটে মনোনিবেশ করেছে জোনাথন। নিউকুয়ের সমুদ্রসৈকতে জোনাথন আর তার বন্ধুরা মিলে বারবিকিউ পার্টি করছিল। তখন ওয়েলস থেকে আসা তাঁদের প্রায় সমবয়সী কিছু ছেলের সাথে আলাপ হয় জোনাথনের। কথায় কথায় ছেলেরা তাকে তার বাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে৷ সে তাঁর বাবার ক্রিকেট ক্যারিয়ার বা তার মৃত্যু নিয়ে তেমন কিছু বলেনি। কিন্তু ছেলেগুলো হঠাৎ তার বাবাকে নিয়ে হাস্যরস শুরু করে৷

জোনাথন বুঝতে পারছিল না কী বলবে বা কী করবে। সে শুধু ভাবছিল, কেউ এতটা অসংবেদনশীল কীভাবে হয়। জোনাথন সেখান থেকে উঠে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়৷ প্রায় দুশো গজ পেরোনোর পর সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। কোনোমতে সমুদ্রসৈকত পার হয়ে একটা দেয়ালের উপর বসে চিৎকার করে কাঁদল জোনাথন, নয় বছরের জমিয়ে রাখা রাগ, অভিমান, কষ্ট যতক্ষণ পর্যন্ত শেষ না হলো, ততক্ষণ কেঁদে গেল সে।

সেই জোনাথন ‘জনি’ বেয়ারস্টো, আজকের ইংল্যান্ড দলের বিধ্বংসী উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। উইকেটকিপিংটাও জন্মসূত্রেই পাওয়া। সেই স্বর্ণকেশ, নীল চোখ পাওয়া বাবার থেকেই। ইয়র্কশায়ারে সতীর্থদের কাছে ডেভিড পরিচিত ছিলেন ‘Bluey’ নামে। নীল চোখের জনি বেয়ারস্টোও তার ‘Bluey’ ডাকনামটা পেয়েছেন উত্তরাধিকারসূত্রেই।

কিন্তু জনি বেয়ারস্টো প্রথমদিকে খুব স্বছন্দ ছিলেন না এই নামে৷ শুধু ভাবতেন, বাবার অনুমতি ছাড়া তার নামটা ব্যবহার করা ঠিক হচ্ছে তো? কিন্তু ডেভিড তো আর বেঁচে ছিলেন না।

সময়ের পরিক্রমায় জনি বেয়ারস্টো হয়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডের সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অন্যতম ভরসার নাম। জনপ্রিয়তার বিচারে ছাড়িয়ে গেছেন বাবাকে। কিন্তু বাবাকে খুব মনে পড়ে তার। বাবার মৃত্যুশোক মানিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু প্রতিটা জন্মদিনে, প্রতিটা অনুষ্ঠানে, প্রতিটা সেঞ্চুরিতে, প্রতিটা অর্জনে বাবাকে খুঁজে ফেরেন জনি বেয়ারস্টো।

১৯৫১ সালের এক সেপ্টেম্বর ইয়র্কশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন ডেভিড বেয়ারস্টো। বাবার জন্ম সাল স্মরণে নিজের জার্সি নাম্বারও ‘৫১’ নিয়েছেন জনি বেয়ারস্টো।

ডেভিড লেসলি বেয়ারস্টো, আপনি বেঁচে থাকবেন। আপনি বেঁচে থাকবেন আপনার ছেলের প্রতিটা শতকে, প্রতিটা অর্জনে, প্রতিটা জয়ে, তার ৫১ নম্বর জার্সিতে, তার স্বর্ণকেশে, তার নীল চোখে, তার ‘Bluey’ ডাকনামে।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...