ম্যাচ কিংবা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে ছয়টা বলই যথেষ্ট!

বিগ ব্যাশের ফ্লাট উইকেট, নামজাদা সব ব্যাটারদের সামনে বল করে উইকেট পাওয়া। কখনো বেধড়ক পিটুনি খেয়েও হাল ছেড়ে না দেওয়া। ফের ফিরে আসার গল্প লেখা। এভাবেই চলছে তাঁর দিন। রিশাদ তো ভালো করেই জানেন, একটা ওভারে ছয়টা বল ছোড়ার সুযোগ সামনে। ম্যাচ কিংবা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ওটাই যথেষ্ট।

একটা শিকারি পাখি, ডানা মিলে উড়ছে আকাশে। নিজের ইচ্ছেমতো শিকার করছে। সে পুরো স্বাধীন, নির্ভার, ভয়হীন। গায়ে লেপ্টে আছে বাংলাদেশের কাঁদা-মাটি-ধুলো। আপাতত অস্ট্রেলিয়ার আকাশটা তাঁর। হ্যাঁ, রিশাদ হোসেনের কথায় বলছি। সে যে উপেক্ষার আঁধার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা এক আলো, অপার সম্ভাবনার এক বাস্তব স্বপ্ন।

নীলফামারীর আলো-বাতাস বয়ে চলছে শরীরের শিরায়-শিরায়। শিরদাড়া শক্ত, টানটান, বুকের ভেতর সাহসের বারুদ ঠাসা। ছেলেটা বড় হতে থাকলো অভিমান নিয়ে, দেশের ক্রিকেটপাড়ায় একটু বিশেষ হলেই যে বিপাকে পড়তে হয়। গড়পড়তার ট্যাগ না থাকলে টিকে থাকা বড্ড কঠিন এখানে। রিশাদ বুঝতে পারেননি আগে, অভিমান বুকে পুষে সময় কাটতো বেঞ্চে বসে।

লেগ স্পিনার বাংলাদেশের এক অমূল্য সম্পদ। সহজে যা মেলে না। সেই সম্পদের গুরুত্ব বোঝেনি ঘরোয়া ক্রিকেটও। অপেক্ষায় কেটেছে প্রতিটা প্রহর, বুকের ভেতর জমা হয়েছে আগুন। মন বলেছে, একবার সুযোগ পেলে দেখিয়ে দেবো।

হ্যাঁ, রিশাদ মনের কথাটা রেখেছেন। বিশ্বক্রিকেটে বারুদের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। বিগ ব্যাশে বাংলার ছেলেটা এখন দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। হোবার্ট হ্যারিকেন্সের সবচেয়ে বড় ভরসা তিনি। এই তো সেই রিশাদ, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) যাকে নখ কামড়াতে হয়েছে বেঞ্চে বসে।

বড় হতে গেলে পরিচিত গন্ডির বাইরে যেতে হয়। কঠিনটাকে আপন করতে হয়। যেখানে প্রতি মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ থাকে, সেখানেই তো শেখা যায়। তবে এটা করতে গেলে সাহস লাগে। আগেই বলেছি, শিরদাঁড়াটা শক্ত, সবটা জুড়ে সাহস আর বিশ্বাসের বীজমন্ত্র, এই মঞ্চটা আমার।

সুযোগ আগেও এসেছিল। তবে ডানা মেলে ওড়ার সুযোগ সেবার দেয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। ঘরোয়া ক্রিকেটে যে তাঁকে দরকার, বড় সম্পদের মর্মটা যে বুঝেছে তখন সবাই। তবে রিশাদ তো গড়পড়তা হতে আসেননি, ওরকম সাহস নিয়ে, সম্ভাবনার আলো হাতে চেনা সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা সবার জন্য শোভনীয় নয়। রিশাদ তাই বেরিয়ে এসেছেন। বিশ্বমঞ্চে নিজের নামের উপর আলোর প্রলেপ দিতে পেরেছেন।

তাঁর বন্ধু এখন নাথান এলিস, যে চোখ বন্ধ করে ভরসা করে তাঁকে। গ্রেট স্টিভেন স্মিথের সাথে একটা হাস্যজ্বল ছবি। ব্রেট লি সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সময়টাকে ফ্রেমবন্দী করা। এ কি বাস্তব, নাকি ভ্রম? এমন সমীকরণ মেলানো। রিশাদের জন্যই যে ওটাই আদর্শ মঞ্চ।

বিগ ব্যাশের ফ্লাট উইকেট, নামজাদা সব ব্যাটারদের সামনে বল করে উইকেট পাওয়া। কখনো বেধড়ক পিটুনি খেয়েও হাল ছেড়ে না দেওয়া। ফের ফিরে আসার গল্প লেখা। এভাবেই চলছে তাঁর দিন। রিশাদ তো ভালো করেই জানেন, একটা ওভারে ছয়টা বল ছোড়ার সুযোগ সামনে। ম্যাচ কিংবা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ওটাই যথেষ্ট।

সব পাখিকে খাঁচায় বন্দি করা যায় না। সব পাখিকে বেধে রাখা যায় না নির্দিষ্ট এক গন্ডির ভেতরে। রিশাদরা শিকারি পাখি, রিশাদরা অন্ধকারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা আলো। এখনও পথ বাকি, সময় কোথায় নিয়ে যাবে কাকে তা বলা যায় না, তবে রিশাদ যে হারিয়ে যাওয়ার জন্য আসেননি সেটা বোধহয় অনুমান করা যায়। ও যে জাত শিকারি, ক্ষিদে পেলে ঠিকই খুঁজে নেবে শিকারকে।

লেখক পরিচিতি

প্রত্যয় হক কাব্য

স্বপ্ন লেখার কি-বোর্ড

Share via
Copy link