প্রতিভা আর পেরে ওঠার মাঝে সূক্ষ্ম এক ব্যবধান থাকে, সেটাকে আমরা বলি চেষ্টা। কেউ এই চেষ্টার সূতোয় ঝুলে সাফল্য অর্থাৎ ওই পেরে ওঠার দরজায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে, আর কেউ ছিঁড়ে যাওয়া সূতোয় ঝুলে পার করে জীবন। সে সাফল্যের দেখা না পেলেও চেষ্টাটা থামায় না। উদাহরণ, মোহাম্মদ মিঠুন।
জন্মটা ১৯৯১ সালে। গড়াই নদীর নিস্তেজ স্রোতধারার মতো বেড়ে ওঠা। শান্ত অথচ দৃঢ় মানসিকতা বীজ বুনে দিল ক্রিকেটার হওয়ার। সেই বীজ বড় হতে লাগল সময়ের সাথে, ফল আসতে দেরি হয়নি খুব বেশি। মাত্র ১৫ বছরেই অভিষেক ঘটে ঘরোয়া ক্রিকেটে।
ছেলেটার চোখেমুখে ঠিকরে বের হওয়া আত্মবিশ্বাস, আর ব্যাট থেকে আসা লম্বা ইনিংস প্রত্যাশাকে দ্বিগুণ করে তোলে। নাম ছড়িয়ে পড়ে কেউ একজন আসছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিপ্লবের পতাকা হাতে নিয়ে। তিনি সব বদলে দেবেন হয়তো, অপারগতার সীমানা পেরিয়ে প্রাপ্তির ঘড়া হয়তো পরিপূর্ণ হবে তাঁর কল্যাণে।
তবে বিপ্লবটাকে খুব বেশিদিন বয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। ধারাবাহিকতার অভাব তাঁর সক্ষমতার সবটুকু বের করে আনতে দেয়নি। ২০০৬-০৭ থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে গেলেও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে উঠতে উঠতে চলে এলো ২০১৪ সাল। তবে সেবারও ডানা মেলে আকাশে ওঠা হয়নি মিঠুনের।

ফর্মটা লুকোচুরি খেলত তাঁর সাথে, দরকারে পালিয়ে বেড়াত। আর ওটাই কাল হয়েছে তাঁর জন্য। সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদদের তুলে দেওয়া দেওয়ালের ফাঁকফোকর গলে যে কটা ম্যাচে সুযোগ পেতেন সেটা কাজে লাগাতে পারেননি।
তাই তো ২০১৪ সালে অভিষেক হলেও দু-চারজনের মুখে নাম ছড়াতে সময় লেগে যায় আরও চার বছর। দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে দলে ফিরেন ২০১৮ সালের এশিয়া কাপে। প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে খেলেন ৬৩ রানের মূল্যবান ইনিংস। একই টুর্নামেন্টে অলিখিত সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রায় একই পরিস্থিতিতে আবারও ৬০ রান করে দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করেন।
এরপরের নিউজিল্যান্ড সফরেই যখন দলের বাকি ব্যাটসম্যানদের যেখানে নাভিশ্বাস উঠেছিল, সেখানে পরপর দুই ম্যাচে দুই ফিফটি মিঠুনের। সবশেষ কিউই সফরেও যে ম্যাচে জয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি ছিল বাংলাদেশ, সে ম্যাচেও দুর্দান্ত এক ৭৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। তবে এমন হাতেগোনা কয়েকটা ভালো ইনিংস দিয়েই তো একজন ব্যাটসম্যানকে কখনোই মানসম্মত বলা যায় না।
তবে একটা বিশ্বাস হয়ে মিঠুন এসেছিলেন। বড় নাম হওয়ার গুণাবলি ছিল তাঁর মাঝে। এই যে বর্তমানে বাংলাদেশের মিডল অর্ডারের ভঙ্গুর দশা চলমান, এর বড় সমাধান যে হতে পারতেন মিঠুন। অভিজ্ঞতা আর পারদর্শিতার যোগফলে এক মহাঔষধ হয়ে উঠতে পারতেন তিনি। তবে এর দায় যতটা তাঁর ততটাই অবশ্য বাংলাদেশের কাঠামোর। পরিচর্যা না করলে গাছে ফুল ধরানো যে কষ্টসাধ্যই।

সে যাইহোক মিঠুন কী পেলেন, কতটুকু প্রত্যাশা মেটাতে পারলেন, সে বিষদ আলোচনার ব্যাপার। তবে ওই যে চেষ্টা তিনি করেছেন। অমিত প্রতিভা নিয়ে আসেননি ঠিকই, তবে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের প্রত্যয় যে ফুটে উঠেছে চোখের কোণে। তিনি হয়তো একটা আক্ষেপ, একটা আফসোসের তীব্র বেদনাদায়ক গল্প। এক অপারগতার পাহাড় তিনি, তবে চেষ্টা কি করেননি মিঠুন? করেছেন, তবে পেরে ওঠা হয়নি, সূতোয় কাটিয়ে দিয়েছেন এক সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার। এটাকে আপনি কিভাবে বিশেষায়িত করবেন? একটা লাইন আছে, সব পেলে নষ্ট জীবন।











