কাবরালের গল্প যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে কেপ ভার্দে। স্কোরবোর্ড বলছে আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু কিছু ম্যাচের গল্প শুধু ফলাফলে লেখা হয় না, লেখা হয় সাহসে, স্বপ্নে আর এমন কিছু মুহূর্তে, যেগুলো বহু বছর পরও মানুষ মনে রাখে।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে কেপ ভার্দে। স্কোরবোর্ড বলছে আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে ম্যাচ জিতেছে। কিন্তু কিছু ম্যাচের গল্প শুধু ফলাফলে লেখা হয় না, লেখা হয় সাহসে, স্বপ্নে আর এমন কিছু মুহূর্তে, যেগুলো বহু বছর পরও মানুষ মনে রাখে।

অতিরিক্ত সময়ের ১০৩তম মিনিট। বাঁ প্রান্ত থেকে বল পেয়ে ভেতরে ঢুকলেন সিডনি লোপেস কাবরাল। এরপর বাঁকানো এক দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়ালেন। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেপ ভার্দের সমতা ফেরানো সেই গোলটি ইতোমধ্যেই দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে গেছে।

গোল করার পর উদ্‌যাপনও ছিল ব্যতিক্রমী। সতীর্থদের দিকে না ছুটে কাবরাল দৌড়ে চলে যান গ্যালারিতে, খুঁজে নেন নিজের প্রেমিকাকে। তারপর আবার ফিরে আসেন মাঠে। কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য হয়তো এই বিশ্বকাপের অন্যতম সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে।

শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে জয়সূচক গোল করে ম্যাচ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। কিন্তু কেপ ভার্দে যেভাবে বিশ্বের অন্যতম সেরা দলকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াইয়ে রেখেছিল, সেটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

২৩ বছর বয়সী কাবরালের গল্পও যেন রূপকথার মতো। নেদারল্যান্ডসের রটারডামে জন্ম। কয়েক বছর আগেও খেলেছেন জার্মানির পঞ্চম বিভাগের এক ক্লাবে। মাসে আয় ছিল মাত্র ৮৫০ পাউন্ডের সমপরিমাণ। কঠিন শীতে ছোট্ট  মাঠে অনুশীলন করেছেন, এমনকি জানালায় পর্দার বদলে ব্যবহার করেছেন ময়লার ব্যাগ। সেই ফুটবলারই আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এমন এক গোল করলেন, যা হয়তো সারাজীবন মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব।

তবে তার পথটা শুধু দারিদ্র্য আর সংগ্রামের ছিল না, ছিল বর্ণবাদের বিরুদ্ধেও এক কঠিন লড়াই। জার্মানিতে খেলার সময় মাঠেই বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পরে বেনফিকায় থাকাকালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্ণবাদী মন্তব্যের মুখে পড়তে হয়। এক সাক্ষাৎকারে কাবরাল বলেছিলেন, “আমাকে ফোন বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক।”

যে মানুষটি একদিন বর্ণবাদের কষ্ট বুকে নিয়ে ফোন বন্ধ করে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেই মানুষটিই আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন এক গোলের নায়ক, যার কথা বহু বছর ধরে মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব।

মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের একটি দেশ। ইতিহাসে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে পুরুষদের বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলেছে কেপ ভার্দে। হয়তো তারা ট্রফি জিততে পারেনি। কিন্তু বিশ্বকাপকে তারা দিয়েছে এমন এক গল্প, যা শুধু ফুটবল নয়, স্বপ্ন দেখার সাহসও শেখায়।

কখনো কখনো পরাজিত দলই সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। কেপ ভার্দে হয়তো বিশ্বকাপ ছেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু সিডনি লোপেস কাবরালের সেই গোল,ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, তাদের অবিশ্বাস্য লড়াই আর হার না মানা মানসিকতা ফুটবল ইতিহাসে অনেক দিন বেঁচে থাকবে।

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link