যেভাবে গতিতারকা বানায় পাকিস্তান

পেস বোলার তৈরিতে বরাবরই অনেক উপরে পাকিস্তান ক্রিকেট। বলতে পারেন গতি তারকা তৈরিতে অন্যান্য ক্রিকেট দেশের চেয়ে বেশ এগিয়ে পাকিস্তান। শোয়েব আখতার, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস থেকে শুরু করে মোহাম্মদ আমির, ওয়াহাব রিয়াজ কিংবা হালের মোহাম্মদ হাসনাইন, হারিস রউফরা এর জ্বলন্ত উদাহরণ। মোহাম্মদ হাসনাইন, হারিস রউফরা গতি দিয়েই আখ্যা পেয়েছেন সম্ভাবনাময়ী ভবিষ্যত তারকা হিসেবে। ঘণ্টায় ১৫০ কিংবা তাঁর বেশি গতিতে টানা বল করে ইতোমধ্যেই মুগ্ধ করেছেন পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে।

পেস বোলার তৈরিতে বরাবরই অনেক উপরে পাকিস্তান ক্রিকেট। বলতে পারেন গতি তারকা তৈরিতে অন্যান্য ক্রিকেট দেশের চেয়ে বেশ এগিয়ে পাকিস্তান। শোয়েব আখতার, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনুস থেকে শুরু করে মোহাম্মদ আমির, ওয়াহাব রিয়াজ কিংবা হালের মোহাম্মদ হাসনাইন, হারিস রউফরা এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

মোহাম্মদ হাসনাইন, হারিস রউফরা গতি দিয়েই আখ্যা পেয়েছেন সম্ভাবনাময় ভবিষ্যত তারকা হিসেবে। ঘণ্টায় ১৫০ কিংবা তাঁর বেশি গতিতে টানা বল করে ইতিমধ্যেই মুগ্ধ করেছেন পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে।

তবে পাকিস্তান ক্রিকেট গতিতারকা তৈরিতে কেন বিখ্যাত? কারণ এর পেছনে রয়েছে সাবেক ক্রিকেটারদের অবদান, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সজাগ দৃষ্টি ও জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির (এনসিএ) নিরলস পরিশ্রম। সম্ভাবনাময়ী তরুন ক্রিকেটারদের বয়সভিত্তিক দল থেকেই তৈরি করতে সবরকম সাপোর্টই করা হয় এনসিবির পক্ষ থেকে। যার কারণে গতির ফোয়ারা ছুটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাতাতে পারছেন হাসনাইন, হারিসরা।

কিভাবে পাকিস্তান ক্রিকেট এই গতি তারকাদের তৈরি করছে সেই পেছনের গল্পটা শোনা যাক এবার।

সাত বছর আগে রমজান মাসের কোনো একদিন মোহাম্মদ হুসেইন হায়দ্রাবাদের হিরাবাদে প্রতিদিনকার মতোই ইফতারের পর দোকান (গবাদি পশুর খাবার বিক্রি) করছিলেন হুসেইন। হায়দ্রাবাদে ইফতারের পর টেপ টেনিস ক্রিকেট বেশ জনপ্রিয়। পাকিস্তানের একজন ক্লাব ক্রিকেটার ছিলেন হুসেইন। বেশ কয়েক বছর খেলেছেন ক্লাব ক্রিকেটে।

প্রতিদিনের মতোই সেদিনও দোকানের কাজ করছিলেন হুসেইন। হঠাৎ দেখলেন রাস্তায় তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে বেশ কিছু তরুনদের সাথে ক্রিকেট খেলছে। ছেলেকে অবশ্য এর আগে কখনোই ক্রিকেট খেলতে দেখেনি হুসেইন। তাই ছেলের প্রতিটি বলই তাকিয়ে দেখলেন। প্রথম ওভারেই মেইডেন দিয়ে তিন উইকেট শিকার করলো হুসেইনের ছেলে! ছেলের পেস আর লাইন-লেন্থে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন হুসেইন!

ব্যাটাররা যেনো বল চোখেই দেখছিলো না। তিনটি বল অল্পের জন্য স্টাম্পের উপর দিয়ে গেলেও বাকি তিন বলে একদম ক্লিন বোল্ড। অল্পবয়সী ছেলের রানআপ আর রিদম দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না হুসেইন!

দোকান ছেড়ে ছেলের কাছে দৌড়ে গেলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাকে কি কেউ শিখিয়েছে কিভাবে বল করতে হবে?’ হুসেইনের মনে হচ্ছিলো কেউ না কেউ তাঁকে বল করা শিখিয়েছে। কারণ তখন হিরাবাদে অনেক পুরোনো ক্রিকেটার ছিলো। কিন্ত ছেলের সোজাসাপটা জবাব ছিলো, ‘না আব্বু, আমি সবসময় এভাবেই বল করি।’

পাকিস্তান ক্রিকেটে একটা কথা হুসেইন বরাবরই শুনে এসেছেন, ‘পেসারদের কখনোই তৈরি করা যায়না, তাঁরা জন্মগতভাবেই তৈরি হয়ে আসে।’ আপনি হয়তো একজন পেসারের অ্যাকশন পরিবর্তন করতে পারেন, কিংবা রান আপে কিছুটা। এছাড়া পেস তো জন্মগতভাবেই তাঁর মধ্যে থাকে। হুসেইন জানতো তাঁর ছেলের মাঝে বিশেষ প্রতিভা আছে। পাকিস্তান ক্রিকেটের অংশ হিসেবে হুসেইনের দায়িত্ব ছিলো ছেলেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য তৈরি করা। সেদিন থেকেই ছেলেকে তৈরি করতে আবারও ক্রিকেটে ফিরেন হুসেইন।

এই মোহাম্মদ হুসেইনের ছেলেই বর্তমানে পাকিস্তান ক্রিকেটে ভবিষ্যত সম্ভাবনাময়ী গতি তারকা মোহাম্মদ হাসনাইন!

১২ বছর বয়সে ক্লাব ক্রিকেটার। সেখান থেকে ১৭ বছর বয়সেই সুযোগ পান অনূর্ধ্ব ১৯ দলে। এরপর এক বছর বাদেই জায়গা পান পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) আর ১৯ বছর বয়সেই পাকিস্তানের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে! ইনজুরির কারণে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ মিস করলেও পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড নজরে রেখেছিলো গতি তারকা মোহাম্মদ হাসনাইনকে।

হুসেইন বলেন, ‘পিসিবি প্রায় ২৫ লাখ রুপি খরচ করেছে হাসনাইনের জন্য।’ তাঁর জন্য একজন ট্রেইনার নিয়োগ থেকে শুরু করে ভ্রমণ খরচ এবং মেডিকেল খরচও দিতো পিসিবি।

কোয়েটা গ্লাডিয়েটরসের মালিক নাদিম ওমরও বেশ অবদান রাখেন হাসনাইনের ক্যারিয়ারে। অনূর্ধ্ব১৯ দলে খেলাকালীনই হাসনাইনের গতির কথা জানতে পেরে কোয়েটা গ্লাডিয়েটরসের হয়ে চুক্তি করেন হাসনাইনের সাথে। ওই সময় ইনজুরড হওয়া সত্ত্বেও কোয়েটা দলে ভেড়ায় হাসনাইনকে। নাদিম বলেন, ‘ওর বলে গতি আছে, ম্যাচ সেরাও হয়েছে। ১৫০+ গতিতে বল করতে পারে, কব্জির জোর অনেক।’

ছোটবেলা থেকেই টিভিতে পাকিস্তানি পেসারদের অনুসরণ করতেন হাসনাইন। এক সন্ধায় বাসায় ফিরে হাসনাইনের কাছে তাঁর বাবা জানতে চাইলেন যখনি আমি বাড়ি ফিরি তখন দেখি যে তুমি ক্রিকেট দেখছো। এর কারণ কি? হাসনাইন জবাবে বলেন, ‘পেসারদেরকে অনুসরণ করি, ওয়াকার ইউনুস, মোহাম্মদ সামি, শোয়েব আক্তারদের মতো বোলিং করতে চাই।’

হুসেইন তখন ছেলেকে বললেন, ‘যে পথে তুমি স্বপ্ন দেখছো এটা সহজ নয়। আল্লাহ একজন আক্তারই বানিয়েছে, একজন ওয়াসিম বানিয়েছে তুমি তাদের মতো হতে পারবেনা। পেস বোলিং কঠিন একটা কাজ। সেটায় উপরওয়ালার কৃপা হওয়া লাগবে।’

তবে হাসনাইন নাছোড়বান্দা। নিজের পছন্দের পেসারদের টিভিতে অনুসরণ করতো আর বাবার কাছে আবদার করতো দ্রুত তাঁকে ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দিতে। তবে ছেলের ক্রিকেট ক্যারিয়ার কেমন হবে এসব ভাবনায় শুরুতে এসবে কর্ণপাত না করে সময় নিচ্ছিলেন হুসেইন। অবশ্য নিজের ছেলেকে বোলিং করতে দেখার আগ পর্যন্তই এই ভাবনা-চিন্তা সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু এরপর ২০১২ সালে রমজানের সেই সন্ধ্যায় ছেলের বোলিং দেখে হতবাক হয়েছিলেন হুসেইন!

২০১২ এর কোনো এক রমজানে ইফতারের পর রাস্তার ধারের বাতির আলোয় এক ভিন্ন আলোর দেখা পান হুসেইন। পরের দিন সকালেই ছেলেকে ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দেন তিনি। হুসেইনের আগের বেশ কিছু সতীর্থরা তখন কোচিং করাতেন।

১২ বছর বয়সী হাসনাইনকে একজন বললেন বোলিং করতে। চোখের পলকে মিনিট কয়েকের মাঝে গতির ফুলঝুরিতে সবাইকে মুগ্ধ করে দেন হাসনাইন! তাঁরা অবাক হয়ে হুসেইনকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এর আগে তোমার ছেলে কোথায় অনুশীলন করেছে? ’ উত্তরে যখন হুসেইন বললেন, ‘না, কোথাও না!’ কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না এতো অল্প বয়সে ছেলে এতো গতিতে বল করছে।

ওইদিন থেকেই ছেলের সাথে সাথে ছিলেন হুসেইন। বড় ছেলেকে কাজের দায়িত্ব দিয়ে হাসনাইনকে নিয়ে অনুশীলনে যেতেন তিনি। হাসনাইনকে ক্রিকেটার বানাতে দুই বড় ছেলে, মেয়ে নিজের ভাগের দুধ (খাবার) পর্যন্ত দিয়ে দিতেন হাসনাইনকে।

হুসেইন বলেন, ‘কাসিম পার্কে ৮ কি.মি দৌড়ে আমরা অনুশীলন শুরু করতাম। দুপুর ২টায় মাঠে যেতাম। আমি ওর কয়েকটা টি-শার্ট সাথে নিয়ে যেতাম। ৪৬-৪৭ ডিগ্রি তাপমাত্রায় দুপুর দুইটায় সে মাঠের ৫ রাউন্ড দৌড়াতো। সে যখন টি-শার্ট খুলতো মনে হতো সারারাত এটি হয়তো পানিতে চুবানো ছিলো। এরপর সে ১০ ওভার বোলিং করতো। এরপর সে আবার টি-শার্ট পরিবর্তন করে নেটে বিভিন্ন ব্যাটারদের আরো দশ ওভার বোলিং করতো। আমরা যখন মাঠ থেকে বের হতাম মাগরিবের আজান পড়তো তখন।’

জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি (এনসিএ) লাহোর প্রধান সাবেক পাকিস্তানি তারকা মুদাসসর নজরও সবসময়ই খবর রেখেছেন হাসনাইনের। তিনি বলেন, ‘তাঁর বলে অনেক গতি আছে। কোনো কোচই আপনার বোলিংয়ে গতি এনে দিতে পারবেনা। একজন কোচ আপনার অ্যাকশন নিয়ে কাজ করতে পারবে। তবে জোরে বোলিংটা আপনাকেই করতে হবে, আপনি জন্মগতভাবে এটা পেয়েছেন।’

শুধু জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিই নয় সাবেক এই তারকার ভাষ্যমতে পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সাবেক বিশ্বকাপজয়ী তারকা ক্রিকেটার ইমরান খানও কোনো গতিময় বোলারের কথা শুনলেই তার ব্যাপারে বিশেষ যত্ন নেওয়ার কথা বলেন! এছাড়া পিসিবির পক্ষ থেকে অতিরিক্ত গতির বোলারদের জন্য আলাদা ক্যাম্প সহ বিশেষ ট্রেইনার নিয়োগ দেওয়া হয়।

প্রায় লম্বা সময় ধরেই জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে আছেন মুদাসসর নজর। ওয়াসিক আকরাম, শোয়েব আক্তারদের নিজ চোখের সামনেই উঠে আসতে দেখেছেন। সাবেক এই তারকাদের উঠে আসার পেছনেও অবদান আছে নজরের। সেই ধারাবাহিকতায় হাসনাইন, রউফদেরও বিশেষভাবে গ্রুমিং করেছেন তিনি।

এভাবেই একদিন লাহোরে ট্রায়াল দিতে গিয়েছিলেন আরেক তরুণ তারকা হারিস রউফ। কালান্দারের হয়ে ট্রায়াল দিতে যেয়ে দেখেন গেইটের সামনে কমপক্ষে ২০ হাজার ক্রিকেটার এসেছিলো ট্রায়াল দিতে! কালান্দারের প্রধান কোচ ছিলেন সাবেক পাকিস্তানি তারকা আকিব জাবেদ। সেখানে ৯২ কি.মি ঘন্টায় বল করে আকিব জাবেদকে আউট করেন হারিস!

কালান্দার ওয়েবসাইটের মতে তাদের কাছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজারের মতো টেপ টেনিস বোলারের তালিকা আছে। কালান্দারের মালিক নাদিম বলেন, ‘টেপ টেনিস ক্রিকেটে আপনি জোরে বল করতে না পারলে আপনি কোনো বোলারই না। টেপ টেনিস বলে জোরে বোলিং করতে পারার সামর্থ্য থাকতে হবে।’

বয়সভিত্তিক দল থেকেই এসব তরুন গতিময় তারকাদের নার্সিং করার কারণেই যুগে যুগে পাকিস্তান ক্রিকেটে দেখা গেছে গতিতারকাদের! একজন তরুনকে জোরে বল করতে দেখলেই কোচ কিংবা ভালো ট্রেইনার দ্বারা নার্সিং করে ওই তরুন পেসারকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার উপযুক্ত করা হয়। এনসিএ থেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্লাব ক্রিকেটে এই পদ্ধতি অনুসরণ করায় বছরের পর বছর পাকিস্তান ক্রিকেট পেয়েছে গতিতারকাদের!

 

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...