কী ভীষণ এক দু:সময়!

সৌরভ দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরবর্তী সিরিজে ওয়ানডে ও টেস্ট উভয় দল থেকেই বাদ পড়েন তিনি। দল থেকে বাদ পড়ার পর সৌরভ গণমাধ্যমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই ঘটনায় ফুঁসে ওঠে ভক্তরা। এমনকি সৌরভকে কেন বাদ দেয়া হলো, এই মর্মে তদন্ত চেয়ে সংসদে বিতর্ক পর্যন্ত হয়। চ্যাপেলের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয় বিভিন্ন জায়গায়।

২০০৩ বিশ্বকাপ ফাইনাল হারার পর থেকে মাঠে এবং মাঠের বাইরের সময়টা ভারতের ভালো যাচ্ছিল না।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায়, ঘরের মাঠে বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে হার, পাকিস্থানের সাথে ওডিআই সিরিজ হারায় ভারতের ক্রিকেটে তখন হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি। এমতাবস্থায় দলের কোচ জন রাইট চুক্তি নবায়ন না করলে নতুন কোচের সন্ধানে নামে বিসিসিআই।

কোচ হিসেবে আগ্রহীদের মাঝে ছিলেন ডেভ হোয়াইটমোর, মহিন্দর অমরনাথ, গ্রাহাম ফোর্ড, ডেসমন্ড হেইন্স, টম মুডিদের মতো বড় বড় সব নাম। কিন্তু ২০০৫ সালের ২০ মে যাকে কোচ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, সেটা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না বেশিরভাগ ক্রিকেটপ্রেমীই।

দুই বছরের চুক্তিতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের নতুন কোচ নিযুক্ত হন গ্রেগ চ্যাপেল; যার কিনা পূর্বে কোচ হিসেবে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। পরবর্তীতে জানা যায় দলীয় অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির বিশেষ সুপারিশেই চাকরি পাকা হয় গ্রেগ চ্যাপেলের। কারণ হিসেবে বলা হয় ২০০৩ অস্ট্রেলিয়া সফরের সময় নাকি চ্যাপেলের পরামর্শের সুফল পেয়েছিলেন গাঙ্গুলি। সৌরভ গাঙ্গুলী হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, তারই এই সিদ্ধান্ত একদিন নিজের জন্যেই কাল হয়ে দাঁড়াবে।

চ্যাপেলের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান অয়েল কাপ’। সেখানে ফাইনালে হেরে যায় ভারত। যদিও দলে ছিলেন না নিয়মিত অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি, আগের সিরিজেই স্লো ওভার রেটের কারণে চার ম্যাচে  নিষিদ্ধ হন তিনি। দলকে নেতৃত্ব দেন রাহুল দ্রাবিড়। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সফরের জন্য দলে ফেরেন সৌরভ। যদিও সেসময় মারাত্নক রানখরায় ভুগছিলেন তিনি, তার সর্বশেষ সেঞ্চুরি ছিল দুই বছর আগে, অজিদের বিপক্ষে ব্রিসবেনে।

জিম্বাবুয়ে সফর শুরুর আগে চ্যাপেল সৌরভকে অধিনায়কত্ব থেকে পদত্যাগ করে ব্যাটিংয়ে আরো বেশি মনোযোগী হতে বলেন। চ্যাপেল দাবি করেন সৌরভের ব্যাটিংয়ের বাজে ফর্ম দলের উপর খারাপ প্রভাব ফেলবে। সৌরভ অধিনায়কত্ব ছাড়তে অস্বাকৃতি জানান। যদিও পরবর্তীতে সেই সিরিজে ব্যাট হাতে তিনি তেমন কিছুই করতে পারেননি।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট শুরুর আগে চ্যাপেল ঘোষণা দেন সৌরভ গাঙ্গুলির পরিবর্তে যুবরাজ সিং এবং মোহাম্মদ কাইফকে খেলানোর। ফলশ্রুতিতে সৌরভ সফরের মাঝপথে ভারত ফিরে আসতে চাইলে দলের ম্যানেজার অমিতাভ চৌধুরি তাকে বাঁধা দেন এবং দল ছাড়তে নিষেধ করেন। নানা নাটকের পর গাঙ্গুলি প্রথম টেস্টে সুযোগ পান এবং দারুণ এক সেঞ্চুরি করেন।

ম্যাচে চোট পাবার পর সৌরভ চোটের নাটক সাজিয়েছেন এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে সৌরভ গাঙ্গুলি প্রথমবারের মতো সংবাদমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের বিরুদ্ধে তাকে অধিনায়কত্ব থেকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করার অভিযোগ করেন, যদিও তিনি সেদিন কারো নাম উল্লেখ করেননি। এছাড়াও বলেন দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা তাকে আরো বেশি তাঁতিয়ে দিয়েছিল সেঞ্চুরি করার জন্য।

সিরিজের পর চ্যাপেল বিসিসিআইকে একটি মেইল পাঠান, যেখানে তিনি গাঙ্গুলির তীব্র সমালোচনা করেন। চ্যাপেল লিখেছিলেন যে, সৌরভ অধিনায়কত্ব বাঁচাতে মরিয়া হয়ে পড়েছেন। তিনি আরো লিখেছিলেন যে, সৌরভ শারীরিক ও মানসিকভাবে দলকে নেতৃত্ব দিতে উপযুক্ত নন।

গ্রেগের মতে, সৌরভের নেতিবাচক মানসিকতা ও চোটের বাহানা দেয়া পরবর্তী বিশ্বকাপে ভারতের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। এই ইমেইল গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেলে এই দুজনের বৈরিতা তীব্র আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে বিসিসিআইয়ের মধ্যস্থতায় দুজনেই ঝামেলা মিটিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার কথা জানান। এর মাঝেই হরভজন সিং সংবাদমাধ্যমে চ্যাপেলকে ভর্ৎসনা করেন এবং গাঙ্গুলির প্রতি অবিচারের প্রতিবাদ জানালে পাঞ্জাব ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চায়। যদিও তিনি পরবর্তীতে ক্ষমা চাওয়ায় আর শাস্তি পেতে হয়নি।

২০০৫ সালে ইনজুরির কারণে সৌরভ শ্রীলঙ্কা সফর মিস করেন। যদিও সিরিজের মাঝপথে তিনি সেরে উঠেন, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা হয় এবং রাহুল দ্রাবিড়ই দলকে নেতৃত্ব দেন। পরবর্তীতে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে প্রথমবারের মতো কোনো কারণ ছাড়াই দল থেকে বাদ দেয়া হয় সৌরভ গাঙ্গুলিকে।

সিরিজের একটা ম্যাচ ছিল কলকাতায়। ইডেন গার্ডেনসে সেই ম্যাচে সৌরভের ভক্তদের দুয়োধ্বনিও শুনতে হয়েছিল ভারত দলকে। এমনকি প্রোটিয়াদের দশ উইকেটের জয় উদযাপন করে কলকাতাবাসী! ভারতের মাটিতে এ দৃশ্য দ্বিতীয়বার আর কখনো দেখার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়।

পরের টেস্ট সিরিজেই সৌরভকে অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে রাহুল দ্রাবিড়কে অধিনায়ক এবং বীরেন্দর শেবাগকে সহকারী অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সিরিজ শুরুর আগে তৎকালীন নির্বাচক যশপাল শর্মা (পরবর্তীতে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়) চ্যাপেলের বিরুদ্ধে অসততা এবং দল বাছাইয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেন।

সিরিজের প্রথম দুই টেস্টে সৌরভ উল্লেখযোগ্য কোনো ইনিংস খেলতে না পারায় তৃতীয় টেস্টের স্কোয়াড থেকে বাদ দেয়া হয় তাকে। তাঁর পরিবর্তে মোহাম্মদ কাইফকে দলে ডাকা হলে তিনি সৌরভের পরিবর্তে খেলতে অস্বীকৃতি জানান। এমতাবস্থায় চ্যাপেল বাজে পরিস্থিতিতে পড়ে গেলে রাহুল দ্রাবিড় অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে দল থেকে সরে যান এবং কাইফকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে পাকিস্তান সফর ও ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড সিরিজে। সৌরভ দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পরবর্তী সিরিজে ওয়ানডে ও টেস্ট উভয় দল থেকেই বাদ পড়েন তিনি। দল থেকে বাদ পড়ার পর সৌরভ গণমাধ্যমের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই ঘটনায় ফুঁসে ওঠেন ভক্তরা। এমনকি সৌরভকে কেন বাদ দেয়া হলো, এই মর্মে তদন্ত চেয়ে সংসদে বিতর্ক পর্যন্ত হয়। চ্যাপেলের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয় বিভিন্ন জায়গায়।

ওয়ানডে ও টেস্ট দল থেকে বাদ পড়ার পর সৌরভ ঘরোয়া ক্রিকেটে ফেরেন এবং রঞ্জি ট্রফিসহ বাকি ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোতে রান করতে থাকেন। তারপরও দক্ষিণ আফ্রিকার সফরে ওয়ানডে দলে জায়গা হয়নি তার। ২০০৬ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ব্যাটসম্যানদের বাজে ব্যাটিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারত হোয়াইটওয়াশ হলে পুনরায় টেস্ট দলে ডাক পান সৌরভ।

দলে ফিরেই নিজের প্রথম ইনিংসে ৫১ রান করেন এবং ঐ সিরিজে দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। টেস্ট সিরিজে দারুণ খেলার সুবাদে ওডিআই দলে ডাক পান তিনি। ওই সিরিজে প্রায় ৭০ গড়ে রান করেন এবং ম্যান অব দ্যা ম্যাচ সিরিজের পুরষ্কার পান। এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০০৭ বিশ্বকাপ দলেও জায়গা করে নেন তিনি।

সৌরভ গাঙ্গুলী ও ভারতের জন্য ২০০৭ বিশ্বকাপ ছিল এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। শিরোপাপ্রত্যাশী দল নিয়ে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ভারত। ভারতের এরকম বাজে পারফরম্যান্সই যথেষ্ট ছিল গ্রেগ চ্যাপেলের পদত্যাগের জন্য। চ্যাপেলের বিদায়ের পর দুর্দান্তরূপে আত্নপ্রকাশ করেছিলেন গাঙ্গুলি। ২০০৭ সালে ৬১.৪৪ গড়ে তিনটি শতক এবং চারটি অর্ধশতকে টেস্টে ১১০৬ রান করেন। সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও ছিলেন সমান উজ্জ্বল, ৪৪.২৮ গড়ে ১২৪০ করেন তিনি।

চ্যাপেল বনাম গাঙ্গুলি বিতর্কে পুরো ভারতীয় ক্রিকেট দুভাগ হয়ে গিয়েছিল। কেউ চ্যাপেলের এই পরিবর্তনকে দেখেছিলেন ইতিবাচকভাবে, তারুণ্যের আগমণ ভেবে। অন্যদের মতে চ্যাপেল ছিলেন একরোখা যিনি কিনা সৌরভের উপর সব দোষ চাপিয়ে গেছেন একতরফা। শচীন টেন্ডুলকার তার আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’তে লিখেছেন যে, গ্রেগ চ্যাপেল দলের মধ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছিলেন, এবং গাঙ্গুলীর সঙ্গে চ্যাপেল যা করেছেন। তা মোটেও ঠিক ছিল না।

হরভজন সিংয়ের মতে, ‘গ্রেগ ভারতীয় ক্রিকেটকে এমনভাবে ধ্বংস করে গিয়েছিলেন যে, আবার সব সামলে উঠতে প্রায় তিন বছর লেগে গিয়েছিল। সবচেয়ে খারাপ দিক হলো তিনি এমন কিছু ক্রিকেটার তৈরি করেছিলেন যারা বাকিদের মাঝে ভুল তথ্য সরবরাহ করে দলের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করায়।’

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ভিভিএস লক্ষ্মণ, জহির খান, মোহাম্মদ কাইফদের মতো ক্রিকেটাররাও চ্যাপেলের সমালোচনা করেন।

চ্যাপেল কোচ হিসেবে দলের জন্য সেরাটা চাইবেন। এটাই স্বাভাবিক ছিল। হয়তো এমন একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, যাতে দলের অন্য খেলোয়াড়রা বুঝতে পারেন যে, ফর্মে না থাকলে স্বয়ং অধিনায়কেরও ছাড় নেই। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে নিজের কঠোরতা দেখাতে গিয়ে একজন খেলোয়াড়ের সাথে অবিচার করে গেছেন তিনি, প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে গেছেন পুরোটা সময়। সৌরভও সম্ভবত এই মানসিক অস্থিতিশীলতা থেকে বেরোতে পারেননি। অবশেষে ২০০৮ সালে অবসর নেন তিনি।

অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান হতে পারেন গ্রেগ চ্যাপেল, তবে ভারতীয় ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে চ্যাপেল ভারতীয় ক্রিকেট মুকুটে কোনো পালক তো যুক্ত করতে পারেননি, বরং লেপে দিয়েছেন কালো দাগ।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...