অপেক্ষা তো সাঙ্গ হল, ফুটবল রোমাঞ্চের কি শেষ আছে!

‘লিভারপুল সঙ্গীতের শহর, শ্রমিক শ্রেণির মানুষের শহর, আবার ফুটবলেরও শহর।’ - বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম ফুটবল ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার। গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী লিভারপুলের বাস প্যারেডে প্রায় সারা শহরের মানুষ নেমে এসেছিল মার্সি নদীর তীরে। এবছরও দীর্ঘ তিরিশ বছর পরে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ হাতে আসার পরে রাস্তায় নেমে পড়তে দ্বিধা করেননি মানুষ। অতিমারীর সময়েও সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ হার মেনেছে জনতার ফুটবল উৎসবের কাছে। গানে গানে, আলোর রোশনাইয়ে নেমে এসেছে বহু প্রতীক্ষিত সোনালি আকাশ। ঝড়ের দিনগুলোতে চলা থামেনি তাদের, এখন শুধুই উজ্জ্বল আকাশ।

১.

হোলি ট্রিনিটি

‘ফুটবল ক্লাবে খেলোয়াড়, ম্যানেজার ও সমর্থকদের নিয়ে একটা হোলি ট্রিনিটি বর্তমান। ক্লাবের কর্তাদের সেখানে জায়গা নেই। তাদের কাজ চেকে সই করা’ – কিংবদন্তি বিল শ্যাঙ্কলির অমর উক্তি।

ঊনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে ইংল্যান্ডের ক্লাব ফুটবলে ফুটবলার এবং সমর্থকদের উপার্জনের অঙ্কে আকাশ পাতাল পার্থক্য ছিল না। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী শ্যাঙ্কলিও তাই মনে করতেন। মাঠের ভিতরের খেলোয়াড় আর মাঠের বাইরে প্রিয় দলের সমর্থনে গলা ফাটানো অগুনতি জনতার মধ্যে আর্থিক বৈষম্য যেন বেশি না হয়। অন্যান্য অনেক শহরের মতই লিভারপুলের বহু শ্রমিক পরিবারেরও সপ্তাহান্তে গন্তব্য ছিল খেলার মাঠ।

বিল শ্যাঙ্কলি কখনও ফিরতেন তাঁদের ঘাড়ে চড়ে, কখনও বা টিকিট জোগাড় করে বিলিয়ে দিতেন শতাধিক সমর্থকদের মধ্যে। জনতার ভিড়ে হেঁটে যেতে যেতে সই বিলোতেন দেদার, খেলোয়াড়েরাও সঙ্গী হতেন সেই ভিড়ে। সাফল্য-ব্যর্থতা ভাগ করে নেওয়ায় দূরত্ব খুব একটা ছিল না।

কয়েক দশকের মধ্যেই ছবিটা আমূল পাল্টে গেল।

আশির দশক থেকে টেলিভিশন স্বত্ব, সম্প্রচার-সহ বিভিন্ন বিষয় এবং ফুটবলের বাণিজ্যিকীকরণে বেশিই জোর দেওয়া হতে থাকে। নব্বইয়ের দশকের গোড়াতেই ইংল্যান্ডের প্রথম ডিভিশন ফুটবল লিগকে ঢালাও ভাবে সাজানোর বন্দোবস্ত হল, স্টেডিয়াম পরিকাঠামো উন্নতির কাজে জোর দেওয়া হল। ১৯৯২ থেকে চালু হল প্রিমিয়ারশিপ, ফুটবল লিগের নাম হল এফএ প্রিমিয়ার লিগ।

সম্প্রচার হল ঝকঝকে, প্রতিযোগিতার মোড়ক হল চোখ ধাঁধানো। নানারকমের স্পনসর, নানারকমের জৌলুস। কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বায়নের হাত ধরে ফুটবল বেরিয়ে পড়ল এশিয়া, আফ্রিকার চ্যানেলে চ্যানেলে। ম্যানেজার, খেলোয়াড়দের আয় বেড়ে গেল একধাক্কায়। রেভিনিউ, লাভ-ক্ষতির হিসেব, ব্যবসায়িক প্রসার সব মিলিয়ে কর্তারা হয়ে উঠলেন সর্বেসর্বা। এক দশকের মধ্যেই ইতালিয়ান লিগকে জনপ্রিয়তায় পিছনে ফেলে দিল প্রিমিয়ার লিগ।

২.

‘জানলার কাঁচে বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে/ হন্যে বাতাস পাল্টে দেবার ইচ্ছে’ (কবীর সুমন)

পাল্টে গেল অনেককিছু। ষাট বা আশির দশকে ঘরোয়া ও ইউরোপীয় ফুটবলে সাড়া জাগানো লিভারপুলের সামনে যেন হঠাৎ অশনিসঙ্কেত। ১৯৮৯-৯০ এ কিংবদন্তি কেনি ড্যাগলিশের প্রশিক্ষণে এল ফুটবল লিগ। সুইডিশ তারকা ডিফেন্ডার গ্লেন হাইসেন, জামাইকান-ব্রিটিশ জন বার্নস, ওয়েলশ কিংবদন্তি ইয়ান রাশ-সহ একাধিক খেলোয়াড়ের উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু কে জানত রেকর্ড আঠারোতম লিগজয় সঙ্গে করে নিয়ে আসবে কয়েকদশকের অপেক্ষার অনন্ত প্রহর?

প্রিমিয়ার লিগের শুরু থেকে লিভারপুলকে টেক্কা দিতে শুরু করল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব, স্যর আলেক্স ফার্গুসনের প্রশিক্ষণাধীন ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড। কেনি ড্যাগলিশের কোচিং-এ ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সও লিগ ঘরে তুলল। এরপর এলেন আর্সেন ওয়েঙ্গার, আর্সেনালকে নিয়ে গেলেন ফুটবল দক্ষতার চরমে। প্রথম চারে মোটামুটি থাকলেও প্রিমিয়ার লিগ এল না লিভারপুলের কাছে।

৩.

‘দেখতে দেখতে সবই পাল্টে যায়’

নব্বইয়ের দশক মানে পাল্টে যাওয়া সময়। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলা কোল্ড ওয়ার থেমে গেল, সোভিয়েতের পতন ঘটল। ভেঙে গেল বার্লিন ওয়াল, জুড়ে গেল দুই জার্মানি। ভাঙতে শুরু করল যুগোস্লাভিয়া, একের পর এক জাতিরাষ্ট্র জন্ম নিল। অন্যদিকে কারাগার থেকে মুক্ত হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার আপার্থেইড বিরোধী আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা।

বিশ্বজুড়ে ঘটনার ঘনঘটা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের জোয়ারের সঙ্গে সঙ্গেই খুলে গেল কমিউনিকেশন ও প্রযুক্তির বিবিধ দিগন্ত। মিডিয়ায় এল নতুনত্ব। উদার অর্থনীতির খুলে দেওয়া দরজা গিলে নিল একটা গোটা সময়ের দলিল, উগরে দিল নতুন সময়কে। ফুটবলেও মুক্ত বাজারের হাওয়া নিয়ে এল নতুন চ্যালেঞ্জ। যে আঁকড়ে ধরতে পারল সে রইল টিকে, অনেকের মুঠো গলে বেরিয়ে গেল সুযোগ, কেউ বা পিছলে পড়ল, কেউ রইল উঠে দাঁড়ানোর অপেক্ষায়।

৪.

উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ অনেকেরই মেলেনি ১৯৮৯-এ। ভেঙে যাওয়া হিলসবোরো স্টেডিয়ামের নীচে চাপা পড়ে ছিল অগুনতি লাশ। লিভারপুলের ৯৬ জন সমর্থকের মৃত্যু ঘটেছিল। ঠিক তার চার বছর আগে হেইসেল স্টেডিয়াম ভেঙে দুর্ঘটনায় জুভেন্তাসের সমর্থকেরা মারা গেলে কালো দাগ লাগে লিভারপুলের সমর্থকদের গায়ে।

দুর্ঘটনা চাক্ষুষ করা লিভারপুল ম্যানেজার ফ্যাগান সেই ট্রমা থেকে বেরোতে না পেরে কোচিং ছেড়ে চলে যান। ১৯৮৯-এর দুর্ঘটনায়ও ব্রিটিশ প্রেস, পুলিশ ও প্রশাসনের একটা বড় অংশ দায় চাপিয়ে দিল লিভারপুলের সমর্থকদের ওপরেই। শুরু হল মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে সমর্থকদের আন্দোলনও।

ন্যায়বিচার মিলতেও সময় লেগেছিল অনেকগুলো বছর।

৫.

হিলসবোরো স্টেডিয়ামে লাশের মধ্যে চাপা পড়া আত্মীয় দাদার স্মৃতি নিয়ে বেড়ে উঠছিল এক ফুটবলার। নব্বইয়ের শেষে লিভারপুলের সিনিয়র টিমে মিলল ডাক। যুগলবন্দি হল চরম প্রতিভাবান মাইকেল আওয়েনের সঙ্গে। হঠাৎ করেই যেন লিভারপুল সমর্থকেরা অক্সিজেন পেলেন নতুন করে। এবার হয়তো ফের আসবে লিগ। নতুন শতাব্দীর শুরুতে ২০০১-০২ মরসুমে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করল লিভারপুল।

২০০৪-এ আওয়েন চলে গেলেন রিয়াল মাদ্রিদের তারকাখচিত দলে বড় ট্রফি জেতার আশায়। আবার অপেক্ষা। সেই ফুটবলারের ওপরে এল বাড়তি দায়িত্ব, একার কাঁধে বয়ে নিয়ে যেতে হবে ক্লাবকে। স্টিভেন জেরার্ড, স্টিভি জি ততদিনে সমর্থকদের নয়নের মণি। ২০০৪-০৫ মরসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইন্যালে অলৌকিক জয় জেরার্ডকে চিরদিনের মত লিভারপুলের কিংবদন্তির আসনে জায়গা করে দিল। কিন্তু, প্রিমিয়ার লিগ চাই।

প্রত্যাশার সে ক্রুশ বহনের দায় নিতে হল তাঁকেই- সে যেন মহাকালের লিখন। ঘরের মাঠ এনফিল্ড থেকে শুরু করে বাইরের যে কোনও মাঠে তিনিই মসিহা, তিনিই পরিত্রাতা, তিনিই ভরসা, ব্যর্থতায় তিনিই আবার হতাশায় ডুবে যাওয়া সমর্থকদের অভিযোগের আঙুলের লক্ষ্য। ২০০৮-০৯ মরসুমে স্পেনের তারকা তোরেসের সঙ্গে জুটিতে ফুল ফোটালেন জেরার্ড। রাফা বেনিটেজের কোচিংয়ে লিভারপুল সেবার অপ্রতিরোধ্য।

কিন্তু না, তীরে এসে তরী ডুবল। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের চার পয়েন্ট পিছনে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করল জেরার্ডের লিভারপুল। ততদিনে অন্যদলে যোগ দেওয়ার যাবতীয় ভাবনা সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। এক মরসুম বাদে তোরেসও ক্লাব ছাড়লেন। যোগ দিলেন উরুগুয়ের প্রতিভাবান স্ট্রাইকার সুয়ারেজ। ২০১৩-১৪ ব্রেন্ডন রজার্সের কোচিংয়ে আবার ফুল ফোটাল জেরার্ডের লিভারপুল।

এবার প্রিমিয়ার লিগ তিনি তুলবেনই। কিন্তু মহাগুরুত্বপূর্ণ চেলসি ম্যাচে মোক্ষম সময়ে পা পিছলে গেল তাঁর। এই বুঝি অপেক্ষা করে ছিল তাঁর জন্য? দল হেরে গেল সেদিন, লিগ জেতার আশায়ও ছেদ পড়ল। জেরার্ড হেরে গেলেন, ক্লান্ত শরীরে আর কিছুদিন খেলে বিদায় নিতে হল ট্র্যাজিক নায়ককে। কিন্তু লিভারপুলের সঙ্গে সমার্থক করে দিয়ে গেলেন নিজের অস্তিত্বকে। ফুটবল রোমাঞ্চ কি একটুও হার মানল?

৬.

‘ও আলোর পথযাত্রী এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না’

একটা দলের লিগ নেই বছরের পর বছর। ইউরোপেও বেশ কিছু বছরে একটা বড় সাফল্য। এমন দলকে এশিয়া, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে সমর্থনের কারণ কী? প্রিমিয়ারশিপের যুগে যুক্তির মাপকাঠি অনুযায়ী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, চেলসি এমনকি ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থক হতেই পারেন টিভিতে, অনলাইনে খেলা দেখা ফুটবল অনুরাগীরা। ইতিহাসের গৌরব কি মাপকাঠি হয়? নব্বইয়ের শেষদিকে কিংবা একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তবুও লিভারপুলের সমর্থক এত কেন?

উত্তরটা রয়েছে ফুটবল রোম্যান্টিসিজমে। লিভারপুল মানেই এক অদ্ভুত বৈচিত্র্যময় যাত্রা। সেখানে রাতজাগা আছে, হতাশায় ভেঙে পড়া, কান্না আছে; রয়েছে দুর্দান্ত সব কামব্যাকের স্মৃতি। প্রতিনিয়ত ওঠানামা ওঠানামা চলে সেখানে। নিজেদের জীবনবোধের সঙ্গে যাঁরা সেই সূত্রে খেলাকে জুড়তে পারেন, তাঁদের অনেকেরই শেষ ভরসা লিভারপুল। শত হার, শত ব্যর্থতাও যাঁদের প্রিয় দল থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে না। আশ্চর্য প্রত্যয়ে জেগে থাকে তাঁদের বিশ্বাস, তাঁদের কণ্ঠে জেগে থাকে পথের গান। কালের যাত্রার ধ্বনি অনুরণিত হয় সে গানে। অন্ধকার দুর্যোগের রাত পার হয়ে আলো ফুটবে, এই আশায় জেগে থাকে একসারি আবছায়া চেনা-অচেনা মুখ।

৭.

‘You’ll never walk alone’

২০১৫। এনফিল্ড। স্টপেজ টাইমে ডিভক ওরিগি-র গোলে লিভারপুল ২-২ ড্র করল ওয়েস্ট ব্রমউইচ এলবিয়নের সঙ্গে। দলকে ডেকে নিলেন নতুন যোগ দেওয়া ম্যানেজার যুর্গেন ক্লপ। সমর্থকদের সঙ্গে গলা মেলাল পুরো দল, লিভারপুলের চিরপরিচিত বিখ্যাত আন্থেমে। অনেকেই ব্যঙ্গ করল, এত দুর্বল দলের সঙ্গে হার বাঁচিয়েও গান গাওয়া!!!

২০১৬-য় ক্লাবের মালিকেরা টিকিটের দাম বাড়ানোয় খেলার মাঝেই ওয়াক আউট করলেন সমর্থকেরা। দাম একই রাখতে বাধ্য হল কর্তৃপক্ষ।

‘পাল্টায় মন পাল্টায় বিশ্বাস’

‘আমাদের এখনই নিজেদের প্রতি সন্দিগ্ধ হওয়া থেকে প্রবল আস্থাশীল হয়ে উঠতে হবে’ – লিভারপুলের দায়িত্ব নেওয়ার পরে বলেছিলেন ক্লপ। এ বার্তা শুধু খেলোয়াড়দের জন্য নয়, সমর্থকদের জন্যও। কথা ছিল, চার বছরের মাথায় অন্তত একটা ট্রফি দেবেন তিনি।

‘আমাদের অসাধারণ অতীত আছেই। আমাদের নতুন করে নিজেদের গল্প তৈরি করতে হবে’ – সেই গল্প তৈরির পথ জুড়ে রইল হেভি মেটাল ফুটবল, সঠিক ট্রান্সফার পলিসির মত একাধিক টেকনিক্যাল বিষয়। আর রইল সমর্থকদের একাগ্রতা।

২০১৯ এর মরসুম শেষে ঘরে এল উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। কিন্তু বহু প্রতীক্ষিত প্রিমিয়ার লিগ? দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইয়ে পেপ গার্দিওলার ম্যাঞ্চেস্টার সিটি লিগ ঘরে তুলল ৯৮ পয়েন্ট পেয়ে। ক্লপের লিভারপুল থামল ৯৭ পয়েন্টে। তবে কি আবার হতাশা? এই কি ভবিতব্য?

২৬ জুন, ২০২০। লিভারপুলের দখলে আরও একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, একটা বিশ্ব ক্লাব কাপ এবং?

৮.

‘হে অতীত, তুমি হৃদয়ে আমার কথা কও, কথা কও।’ (রবীন্দ্রনাথ)

‘এই দলের ইতিহাস গড়ে উঠেছে কেনি ড্যাগলিশ, গ্রেম সোনেসদের কৃতিত্বে। এই জয় তাঁদেরও। অবশ্যই শ্যাঙ্কলি, পেইজলি, ফ্যাগান যা করেছেন তা অতুলনীয়, কিন্তু খেলোয়াড়দের অবদানও অনস্বীকার্য।

এই জয় স্টিভেন জেরার্ডের জন্যও। গত কুড়ি বছর ধরে ক্লাবের ইতিহাস তৈরি হয়েছে জেরার্ডের পায়েই। অবিশ্বাস্য চাপ নিয়ে নিজের কাঁধে করে ক্লাবকে টেনে নিয়ে গেছেন জেরার্ড। আমরা প্রচন্ড খুশি যে তাঁকে এই জয় উৎসর্গ করতে পারছি। দলের ছেলেরা এই ক্লাবের অংশ হিসেবে গর্বিত, এই ক্লাবের ইতিহাস এবং একটা গোটা গল্পের অংশ হতে পেরে তারা ভীষণ খুশি। গত দুবছর ধরে অতীতকে কীভাবে নিজেদের যাত্রার অংশ করতে হয় তা আমরা শিখেছি, যা এককথায় অসাধারণ।’

১৯৯০-২০২০। অপেক্ষাটা ৩০ বছরের। কারোর কাছে হয়তো একটু কম। কিন্তু গৌরবের সেই ইতিহাসে আরও একটা অধ্যায় জুড়ে দেওয়ার পরেও অতীতকে নিজেদের গল্পের অংশ করে নেওয়া- যুর্গেন ক্লপ ছাড়া কেই বা পারতেন? শ্যাঙ্কলির হোলি ট্রিনিটির ধারণাকে মূর্ত করে তুলতেই বা আর কে পারতেন এত বছর পরে? পেশাদারিত্বের মোড়ক সরিয়ে রেখে কান্নায় ভেঙে পড়তেই বা আর কে পারতেন?

৯.

‘লিভারপুল সঙ্গীতের শহর, শ্রমিক শ্রেণির মানুষের শহর, আবার ফুটবলেরও শহর।’ – বলেছিলেন প্রবাদপ্রতিম ফুটবল ম্যানেজার আর্সেন ওয়েঙ্গার। গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী লিভারপুলের বাস প্যারেডে প্রায় সারা শহরের মানুষ নেমে এসেছিল মার্সি নদীর তীরে। এবছরও দীর্ঘ তিরিশ বছর পরে প্রথম প্রিমিয়ার লিগ হাতে আসার পরে রাস্তায় নেমে পড়তে দ্বিধা করেননি মানুষ। অতিমারীর সময়েও সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ হার মেনেছে জনতার ফুটবল উৎসবের কাছে। গানে গানে, আলোর রোশনাইয়ে নেমে এসেছে বহু প্রতীক্ষিত সোনালি আকাশ। ঝড়ের দিনগুলোতে চলা থামেনি তাদের, এখন শুধুই উজ্জ্বল আকাশ।

এই শহরেই রয়েছে জন লেনন এয়ারপোর্ট। এই শহরেই গেরি ও পেসমেকারের গাওয়া ‘You’ll never walk alone’ লিভারপুলের সমর্থকদের হৃদয়ের গান হয়ে ওঠে। এটাই লিভারপুল। এখানেই স্বপ্ন সত্যি হয়।

১০.

স্মৃতি জুড়ে শুধু ছবি উঠে আসছে। স্লাইডের পর স্লাইড সরে যাচ্ছে। ক্লপ, হেন্ডারসন, ট্রেন্ট, সালা, মানেদের পার হয়ে জেরার্ড, কারাঘার, আলোনসো, তোরেস, বেনিতেজ, রজার্স কিংবা আওয়েন, ফাওলারের মত খেলোয়াড় বা কোচের নাম কিংবা ডেভ ইভান্স, সিন কক্স ও নাম না জানা একঝাঁক লাল জার্সি পরে চিৎকার করা আবছায়ামুখ, কেউ বা বেঁচে আছেন, কেউ বা নেই। কেউ হয়তো তিরিশ বছরের অপেক্ষায়, কেউ কুড়ি, কেউ দশ, কেউ বা আরও কম। অবশেষে প্রিমিয়ার লিগ এসেছে। Next Year is Ours এর Next শব্দ কেটে This বসে যাচ্ছে। একঝাঁক কান্না, হতাশা, যন্ত্রণা, আনন্দের মুহূর্ত এক লহমায় নেমে আসছে চোখের সামনে। যাত্রাপথের বিভিন্ন গল্প।

এক অপেক্ষা তো সাঙ্গ হল। কিন্তু ফুটবল রোমাঞ্চের কি শেষ আছে?

তার অন্য নামই যে লিভারপুল ফুটবল ক্লাব।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...