প্রেমিক মনের গুগলি সম্রাট

তিনি প্রেমের টানে পাকিস্তান ছেড়ে আসেন যুক্তরাজ্যে। সেখান থেকে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। আর সেটা করতে গিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেট, ইংলিশ কাউন্ট্রি, আইপিএল, বিগ ব্যাশ মিলিয়ে ২৫-টিরও বেশি দলে খেলেছেন, বিভিন্ন কন্ডিশনের অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। আর এত এত অভিজ্ঞতায় তিনি হয়ে উঠেছেন সময়ের অন্যতম সেরা লেগ স্পিনার। এই যুগে এসে তাঁকে গুগলির সম্রাট বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলেছেন – এমন অনেক নজীর আছে। কোটা প্রথার কারণে সেই দেশের অনেকেই সেখানকার জাতীয় দলে জায়গাটা সবসময় নিশ্চিত মনে করেন না। সেখান থেকে ইমরান তাহির অভিনব এক দৃষ্ঠান্ত স্থাপন করেছেন। কারণ, তিনি পুরোদস্তর ‘পাকিস্তানি’ হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে।

এর পেছনেও আছে অভিনব এক গল্প। আসলে তিনি প্রেমের টানে পাকিস্তান ছেড়ে আসেন যুক্তরাজ্যে। সেখান থেকে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়। আর সেটা করতে গিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেট, ইংলিশ কাউন্ট্রি, আইপিএল, বিগ ব্যাশ মিলিয়ে ২৫-টিরও বেশি দলে খেলেছেন, বিভিন্ন কন্ডিশনের অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। আর এত এত অভিজ্ঞতায় তিনি হয়ে উঠেছেন সময়ের অন্যতম সেরা লেগ স্পিনার। এই যুগে এসে তাঁকে গুগলির সম্রাট বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারীতে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে শীর্ষে পৌছে যান ইমরান তাহির। ৩৭ বছর বয়সে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টিতে বোলার র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে উঠেন তিনি। তাঁর পারফর্মেন্স এটাই প্রমাণ করে যে, সর্বোচ্চ স্থরের ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য বয়স কোনো বাঁধা হতে পারে না। প্রতিপক্ষের উইকেট শিকারের পর তাঁর ট্রেডমার্ক দৌড় কিংবা মাঠের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং খেলার প্রতি উদ্দীপনা তাকে বেশ এগিয়ে নিয়ে গেছে।

ইমরান তাহিরের জন্ম পাকিস্তানের লাহোরে। তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুটাও পাকিস্তানে। পাকিস্তান অনুর্দ্ধ ১৯ দলের হয়ে এমনকি পাকিস্তান ‘এ’ দলের হয়েও খেলেছেন তিনি। কিন্তু নিজেকে পরবর্তী স্থরে নিয়ে যেতে সম্পূর্ণ রুপে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। ওই সময়ে পাকিস্তান দলে ছিলো বেশ কিছু ভালো মানের স্পিনার। তাদেরকে সরিয়ে তাহিরকে দলে ডেকে নেবার মত পারফর্ম করতে পারেননি ইমরান তাহির।

তাহির যখন বুঝতে পারেন তিনি পাকিস্তান দলে খেলতে পারবেন না, তিনি তখন পাকিস্তান ছেড়ে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। সেখানে খেলতে শুরু করেন কাউন্টি ক্রিকেট। কিন্তু সেখানেও স্থির থাকেন নি তিনি। এবার পাড়ি জমালেন দক্ষিণ আফ্রিকাতে। কিন্তু সেটা ক্রিকেট খেলার জন্য নয়, প্রেমের টানে।

তাহিরের স্ত্রী ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক। সেখানেই স্থায়ী ক্রিকেট খেলা শুরু করেন ইমরান তাহির। এটা ছিলো তাহিরের ক্যারিয়ারে জন্য এক টার্নিং পয়েন্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটেই এমনিতেই ছিলো মান সম্পন্ন স্পিনারের অভাব, সেখানে তাঁর আগমণ তাহিরের ক্যারিয়ার ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ছিলো যথেষ্ঠ। আর সেটাই ঘটেছে ইমরান তাহিরের সাথে।

এটাই ছিলো ইমরান তাহিরের ক্যারিয়ারের শুরু গল্প।

দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ২০১১ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কেপ টাউনে টেস্ট ক্রিকেটে পা রাখেন ইমরান তাহির। আর তখন থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকা দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন ইমরান তাহির। ২০১৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে উপেক্ষিত ছিলেন তাহির। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে দলে ফিরেই দূর্দান্ত এক পারফর্ম করেন তিনি। টেস্টের প্রথম দিনেই পাকিস্তান দলের পাঁচ উইকেট তুলে নেন তিনি। এরপর আরো একবার দক্ষিণ আফ্রিকা দল থেকে বাদ পড়েন তিনি।

ভারতের বিপক্ষে এক টেস্ট খারাপ খেলার কারণে দল থেকে বাদ পড়েন তিনি। তাঁর বদলে খেলানো হয় রবিন পিটারসেনকে। টেস্ট ক্রিকেটে দলে যাওয়া আসার মধ্যে থাকলেও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন ইমরান তাহির। ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী ছিলেন ইমরান তাহির। এই বিশ্বকাপে ১০.৯১ গড়ে নিয়েছেলেন ১২ উইকেট। এর পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকা দলে সব সংস্করণেই নিয়মিত হতে শুরু করেন। স্পিন বান্ধব উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিং আক্রমণের অন্যতম নেতা ছিলেন ইমরান তাহির।

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছেন তিনি। এই সংস্করণে বোলিংয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র ছিলো তাঁর। যা ব্যাটসম্যানদে পক্ষে খেলা ছিলো প্রায় অসম্ভব। টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানরা রান করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেতেন। এর কারণে টেস্ট ক্রিকেটে বেশ দেখে শুনে খেলতে পারতেন ইমরান তাহিরকে। কিন্তু সীমিত ওভারে রান করার চাপ থাকার কারণে ইমরান তাহিরকে খেলতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে আসতেন ব্যাটসম্যানরা।

এটা ভাবা প্রায় অসম্ভব যে, তাহিরের ক্যারিয়ার কোথায় গিয়ে শেষ হবে। ইমরান তাহির এখনো দূর্দান্ত ফিটনেসের অধিকারী এবং ফিটনেস নিয়ে কাজ করেন। তিনি যেভাবে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তাতে আরো বেশ কিছুদিন তাকে ক্রিকেট মাঠে দেখা যাবে এটা ধরে নেওয়াই যায়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পাশাপাশি সারা বিশ্ব জুড়ে হওয়া ফ্রাঞ্চাইজি লিগেও বেশ দূর্দান্ত পারফর্ম করছেন তিনি। প্রায় সব ফ্রাঞ্চাইজি লিগেই খেলতে দেখা যায় ইমরান তাহিরকে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) এও বেশ দুর্দান্ত খেলেছেন তিনি। আইপিএলে তিনি খেলেছেন দিল্লি এবং চেন্নাইয়ের হয়ে। দুই ফ্রাঞ্চাইজিতে তিনি ছিলেন সেরা পারফর্মার।

ইমরান তাহিরের সীমিত ওভারে ক্রিকেটে অভিষেক ২০১১ সালের বিশ্বকাপে। তিনি ২০১১ বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার জন্য যোগ্য হন। খেলার যোগ্য হবার পর বিশ্বকাপের আগে ভারত সফরের জন্য তাকে দলে রাখা হয়েছিলো, কিন্তু সেই সিরিজে তাঁর অভিষেক ঘটে নাই। তখনকার দক্ষিণ আফ্রিকা দলের অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ বিশ্বকাপের মঞ্চে ইমরান তাহিরকে গোপন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলো।

অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দেন তিনি। বিশ্বকাপে খেলা পাঁচ ম্যাচে ১০.৭১ গড়ে শিকার করেছিলেন ১৪ উইকেট। তাহির বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইনালে নিউজিল্যান্ডে বিপক্ষে ৩২ রানে ২ উইকেট নেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা দল ব্যাট হাতে ২২১ রানে তাড়া করতে না পারার কারণে ২০১১ বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে উঠা হয় নাই দক্ষিণ আফ্রিকার।

এই বিশ্বকাপের পর নিজেকে আরো শাণিত করেন ইমরান তাহির। চার বছরের মধ্যে পরিণত হন বিশ্বের অন্যতম সেরা বোলার এবং ওয়ানডেতে বোলারদের নেতা। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মত ওয়ানডে বোলিং র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে উঠেন তিনি। ২০১৫ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে পেসারদের স্বর্গে মরনে মরকেলে পর দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় সেরা বোলার ছিলেন তিনি।

এই বিশ্বকাপে ২১.৫৩ গড়ে শিকার করেছিলেন ১৫ উইকেট। এই বিশ্বকাপেও নক আউট পর্ব থেকে বাদ পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। সেমি ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিলো নিউজিল্যান্ড। সেমি ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে সবচেয়ে মিতব্যয়ী বোলার ছিলেন ইমরান তাহির, দিয়েছিলে ৯ ওভারে ৪০ রান।

মাত্র দুই বিশ্বকাপ দূর্দান্ত খেলেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ ইতিহাসের তৃতীয় সেরা বোলার হয়েছিলেন তিনি। তাঁর সামনে ছিলেন শুধু অ্যালান ডোনাল্ড এবং শন পোলক। আরো একটি বিশ্বকাপে ভালো খেলতে পারলে হয়তো তাদেরকে ছাড়িয়ে যেতে পারতেন তিনি।

২০১৯ বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান তিনি। তাহির চেয়েছিলেন তিনি বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে বিদায় নিতে। কিন্তু কেন যেন, ক্রিকেটের বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট মানেই যেন দক্ষিণ আফ্রিকার খারাপ খেলার উৎসাহ। এই কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যসব কিংবদন্তীদের মত বিশ্বকাপটা ছুয়ে দেখা হয়ে উঠে নাই ইমরান তাহিরের।

ইমরান তাহিরের সম্পর্কে একটা মজার তথ্য দিয়ে শেষ করা যাক। ইমরান তাহির বিশ্বজুড়ে প্রায় ২১-২২ টি দলের হয়ে পেশাদার ক্রিকেট খেলেছেন এবং এখনো খেলে যাচ্ছেন। যত দীর্ঘ সময় এই যাত্রা চলবে, ততই নিশ্চয়ই দানবীয় হয়ে ‍উঠবেন তাহির!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...