সাহসের নাম নীতা কিংবা ভেলেতা

নীতা চুল ছেঁটে ফেললেন। মাথায় উঠল পুরু উলের টুপি। বুকের স্ফীত নারীত্ব সমান করা হলো পোশাকের আস্তরণে। শরীরেও ঢোলা পোশাক। একজন নারী দৌড়ালে নেকড়েমানবদের চোখ কী দেখে চিকচিক করে ওঠে, নীতা তা জানতেন। কোমরটা তাই ঢেকে ফেলা হলো ঢোলা পোশাকে। জলতরঙ্গ যৌবনের নীতা হয়ে উঠলেন ছেলেদের দলের ফুটবলার ভেলেতা!

‘বাসস্টপে সারাদিনের কর্মক্লান্ত হাতে গুচ্ছ কাগজপত্র ব্যাগ নিয়ে একটি মেয়ে, নিতান্তই সাধারণ একটি মেয়ে আমার বাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়। তার চূর্ণকুন্তল মুখ এবং মাথার চারপাশ ঘিরে জ্যোর্তিমন্ডল তৈরি করেছে। কিছু বা ঘামে লেপটে গেছে। তার মুখের পাশে সুক্ষ ব্যথার দাগগুলোতে ইতিহাস খুঁজে পাই।’

ঋত্বিক এভাবে আবিষ্কার করেছিলেন তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’–র নীতা কে। স্পেনের আলো, হাওয়া, কাদাজলেও এমন এক নীতা বেড়ে উঠেছিলেন।

মালাগার খুব সাধারণ ঘরে জন্ম। সংসারের ঘানি টানার জীবন। ঋত্বিকের নীতা যেমন পরিবারের ঘানি টানার মাঝেও বাঁচার স্বপ্ন দেখতেন, এই নীতাকে স্বপ্ন দেখাত ফুটবল।

মা–বাবার একদম সায় ছিল না। ওদিকে মালাগার আর্টিলারি ব্যারাকসের মাঠে খেলাটা শিখে ফেলেছিলেন নীতা। সে জন্য সাপ মারা মার খেতে হয়েছে বাবা–মায়ের হাতেই। অথচ বাবা ছিলেন পেশাদার ফুটবলার!

ঋত্বিকের নীতাকে বাঁচার স্বপ্ন দেখাত সনৎ। এই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত পুড়েছে ছলনার ধূপকাঠি হয়ে। মালাগার নীতার স্বপ্নও পুড়ে যেত যদি গ্যালিসিয়ান পাদ্রী ফ্রান্সিসকো মিগুয়েজের সঙ্গে তাঁর দেখা না হতো।

ঠিক কোথায় প্রথম দেখা, তা ইতিহাসে নেই। হয়তো মারের চোটে পিঠে কালশিটে পড়া মেয়েটা কাঁদছিল রাস্তার এক কোণে, চোখের জলের মতো বলটা হয়তো গড়গড়া খাচ্ছিল পাশেই—মিগুয়েজের বুঝতে সময় লাগেনি।

পোলিশ পরিচালক ইউরেক বোগায়ভিচের ‘এজেস অব দ্য লর্ড’ সিনেমায় ‘যীশু’ হতে চাওয়া সেই দেবতুল্য শিশু ‘তোলো’কে রক্ষায় পাদ্রী (উইলিয়ান ড্যাফো) যতটা নিংড়ে দিয়েছিলেন, মিগুয়েজও হয়তো কমতি রাখেননি। এই পাদ্রীর আশকারাতেই নীতার ফুটবলার হয়ে ওঠার শুরু। এই পাদ্রীই তাঁকে নিয়ে আসেন নিজের প্রতিষ্ঠা করা স্পোর্টিং ক্লাব ডি মালাগায়।

সিভিল ওয়ারের আগে স্পেনে ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের ফুটবল খেলার কথা কেউ ভাবত না। সামাজিক বিধিনিষেধের ঘেরাটোপ ছিল। কিন্তু এই নীতা যেন আরেক সনোরা ওয়েবস্টার কারভার—ঘোড়া চড়ে অনেক উঁচু থেকে পানিতে ডাইভ দেওয়ার খেলা দেখানো প্রথম নারী।

পরিচালক স্টিভ মাইনার সনোরাকে রুপালী পর্দায় ধারণ করেছিলেন ‘ওয়াইল্ড হার্টস কান্ট বি ব্রোকেন’ সিনেমায়। এতিম মেয়েটি খালার বাড়ি থেকে পালিয়ে যোগ দিয়েছিল সার্কাসে। ডাইভার তাঁকে হতেই হবে!

নীতাও এক সময় গাছে চড়ে দেয়ালের ওপাশ থেকে দেখেছে মালাগার খেলা। ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন ধোপানি ও ম্যাসাজ সহকর্মী হিসেবে। কিন্তু মন তো মানে না! এগিয়ে আসলেন তাঁর নানী, খেলে গেল বুদ্ধির ঝিলিক।

নীতা চুল ছেঁটে ফেললেন। মাথায় উঠল পুরু উলের টুপি। বুকের স্ফীত নারীত্ব সমান করা হলো পোশাকের আস্তরণে। শরীরেও ঢোলা পোশাক। একজন নারী দৌড়ালে নেকড়েমানবদের চোখ কী দেখে চিকচিক করে ওঠে, নীতা তা জানতেন। কোমরটা তাই ঢেকে ফেলা হলো ঢোলা পোশাকে। জলতরঙ্গ যৌবনের নীতা হয়ে উঠলেন ছেলেদের দলের ফুটবলার ভেলেতা!

অ্যাওয়ে ম্যাচগুলো খেলতেন বেশি, যেন কেউ চিনতে না পারে। কিন্তু এই সত্য অনেকেরই সহ্য হয়নি। নীতা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হলেন। নীতা ধরা পড়লেন!

পরের দৃশ্যপট ‘ম্যালেনা’ সিনেমার সেই দৃশ্যের মতো। সিসিলিয়ান শহর ক্যাসলকুতোর রাস্তায় পড়ে আছেন ম্যাদালেনা স্কোর্দিয়া ম্যালেনা। তাঁর চুল কদমছাঁট করে ফেলা হলো। নিরাভরণ শরীর রক্তাক্ত, পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা নারীরা উল্লসিত।

নীতাকেও সমাজ, রাস্ট্র ও আইন ক্রুশবিদ্ধ করেছিল। নারীরা–ই মেনে নিতে পারেনি, পুরুষদের কথা বাদ দিন। বাবাও তাঁকে সে সময় আশ্রয় দেননি। লোকে থুতু মেরেছে, পাথর ছুঁড়েছে, আর শ্লেষাত্মক কথা তো ছিলই। কর্তৃপক্ষও বসে থাকেনি। নীতার ফুটবলার হওয়ার ঔদ্ধত্য ‘পাবলিক স্ক্যান্ডাল’ হিসেবে দেখে তাঁকে ঘরে বন্দী রেখেছে। চুল চেঁছে ন্যাড়া বানিয়েছে।

তবু নীতাকে থামানো যায়নি। এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় (ভেলেজ এফসি) গিয়ে খেলেছে। শেষ পর্যন্ত ৩২ বছর বয়সে টাইফাস–জ্বরের কাছে নীতার হারের পর হাড় জুড়োয় লোকজনের।

আনা রুইজ কারমোনা—বাবার বড় আদরের ‘নীতা’। স্পেনে নারী ফুটবলের পথিকৃৎ হিসেবে ইরিন গঞ্জালেস এবং এই নীতাকে মনে রেখেছে ইতিহাস। জন্ম ১৬ মে, ১৯০৮।

সান রাফায়েল সমাধিক্ষেত্রে দাফনের সময় নিজের প্রাপ্যের কিছুটা বুঝে পেয়েছিল মেয়েটি। তখন মেয়েটির পরনে ছিল স্পোর্টিং ডি মালাগার জার্সি!

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...