পক্ষপাতদুষ্ট স্পিরিট অব ক্রিকেট

বিশেষ করে যখন র‌্যাংক টার্নার বানানো হয়, তিনি কোথা থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেন। আবার বিষয়টা যখন উপমহাদেশীয় দলের ফলাফল আসে, তখন তিনি বেশি সরব হন। কিন্তু, তিনি নীরব থাকেন পেস-ট্র্যাকের ক্ষেত্রে। নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার ঘাসে ঢাকা উইকেটের খেলা ম্যাচগুলোর সময় তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না - তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকেন।

এই ভদ্রলোককে আমি কখনো দেখি নি। আমি বিশ্বাস করি, কেউই কোনোদিনও দেখেননি। তারপরও ক্রিকেট ম্যাচ হলে উঠতে বসতে তাঁর প্রসঙ্গ আসে। অনেক তর্ক বিতর্ক হয়। অন্যরকম কিছু ঘটলেই সব নষ্ট হয়ে গেল বলে রব ওঠে।

আমি ভাবি এই ‘ক্রিকেট স্পিরিট’ কিংবা স্পিরিট অব ক্রিকেট ভদ্রলোকটা সম্ভবত খুব প্রতাপশালী একজন। সব জায়গায়ই তাকে নিয়ে আলোচনা হয়। আবার ভাবি তিনি সম্ভবত খুবই ঠুনকো কেউ। না হয়, একটু এদিক সেদিক হলেই কেন ক্রিকেটের স্পিরিট নষ্ট হয়ে যাবে।

বিশেষ করে যখন র‌্যাংক টার্নার বানানো হয়, তিনি কোথা থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেন। আবার বিষয়টা যখন উপমহাদেশীয় দলের ফলাফল আসে, তখন তিনি বেশি সরব হন। কিন্তু, তিনি নীরব থাকেন পেস-ট্র্যাকের ক্ষেত্রে। নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার ঘাসে ঢাকা উইকেটের খেলা ম্যাচগুলোর সময় তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় না – তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকেন।

আচ্ছা তিনি এক পক্ষপাতদুষ্ট কেন!

কথা গুলো বলছি আহমেদাবাদ টেস্টের প্রসঙ্গে। টেস্টে স্পিনে ত্রাস ছড়িয়ে ভারত দুই দিনেরও কম সময়ের মধ্যে জিতে গেছে। জয়টা এসেছে ১০ ব্যবধানে। ইংল্যান্ডের যে ২০ টা উইকেট গেছে তাঁর ১৯ টিই নিয়েছেন ভারতীয় স্পিনাররা। ১৪০ ওভারে শেষ হওয়া ম্যাচে যে ৩০ ‍টি উইকেট গেছে তাঁর মধ্যে ২৮ টি পেয়েছেন স্পিনাররা।

জো রুটের মত পার্টটাইম অফস্পিনাররাও পাঁচ উইকেট পেলেন আট রানের বিনিময়ে। আর  এখানেই যত সমস্যা। কেউ কেউ ভয় পেলেন, এমন স্পিন নির্ভর উইকেটের কারণে না আবার আইসিসি ডিমেরিট পয়েন্ট দিয়ে বসে! কেউ কেউ নিজেদের টিম ম্যানেজমেন্টেরই ঘোর সমালোচনা করলেন। তবে, সবচেয়ে বেশি আলোচনা হল ক্রিকেটের স্পিরিট নিয়ে। পান থেকে চুন খসলেই তো নাকি তাঁর সম্ভ্রমহানি ঘটে। বিশেষ করে রিকি পন্টিং আর মাইকেল ভনের মত অস্ট্রেলিয়ান আর ইংলিশ কিংবদন্তিদের যেন মাথায় আগুন ধরে গেল।

আচ্ছা এই ক্রিকেটের স্পিরিট ভদ্রলোকটা কে!

ক্রিকেটের স্পিরিট কথাটা এসেছে পাশ্চাত্যের ক্রিকেট লিখিয়েদের হাত ধরে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে ইংরেজদের হাত ধরে কথাটির উৎপত্তি। যেহেতু সেখানেই খেলাটির জন্ম, তাই তাঁরা সব কিছু নিজেদের মত করে, মানে ইংলিশ বা অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনের মত দেখতে অভ্যস্ত। আরো স্পষ্ট করে বললে, পেস-বান্ধব উইকেটের বাইরে তাঁরা কিছু দেখতে অভ্যস্ত নন।

তাই, টেস্টের আর্লি পেস মুভমেন্ট সেখানে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্য, আর আর্লি টার্ন ক্রিকেট স্পিরিটের স্খলন। অ-উপমহাদেশীয় দেশগুলো যেহেতু এমন উইকেটের সাথে পরিচিত হয়, তাই তাঁদের মতে এটাই ক্রিকেট স্পিরিটের বিরোধী। মানে, নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা আর কি! যেহেতু আমরা সবাই এমন ক্রিকেট সাহিত্য ও লেখালেখি পড়েই বড় হয়েছি, কিংবা আমরা যারা লেখালিখি করি, তারাও এসব লেখাই অনুসরণ করি, তাই ইংরেজদের এই ফর্মুলাকে আমরা আপ্তবাক্য বলে মেনে নেই।

এবার আসি আহমেদাবাদ টেস্টের উইকেটের প্রসঙ্গে। মোরেতার এই মাঠটায় এমনিতেই টেস্টটা ছিল দিবারাত্রীর টেস্ট, তাঁর ওপর গোলাপি বলের খেলা। ফলে এই উইকেটে সন্দেহজনক মাত্রার আন-ইভেন বাউন্স, টার্ন থাকবেই। মানে, এই স্পিন যে সিলেবাসের বাইরে যাবে – সেটা না বলে দিলেও চলে।

 পেস ধরে এমন ট্র্যাকে যেমন ব্যাটসম্যানের টেকনিক ভাল থাকলে তিনি রান পাবেন, তেমনি স্পিনিং উইকেটেও টেকনিক ভাল থাকলে রান পাবেন। ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের টেকনিক নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না, কিন্তু স্পিনে যে তাঁরা দুর্বল, এসব উইকেট, এসব ট্র্যাকে খেলতে যে তাঁদের অনভ্যস্ততা আছে – সে নতুন কোনো ব্যাপার নয়।

উপমহাদেশের বাইরের ক্রিকেটারদের এই স্পিনিং উইকেটে খেলার টেকনিকটা প্রাকৃতিক কারণেই খুব একটা ভাল জানা নেই। তাই উইকেটের ওপর দোষ চাপিয়ে, কখনো ক্রিকেটের স্পিরিট নামক ভদ্রলোকটিকে টেনে এনে বেঁচে যেতে চান তাঁরা।

ক্রিকইনফোতে একজনের মন্তব্য খুব মনে ধরলো। তিনি লিখেছেন, ‘এমনটি টেনিসও ভিন্ন ভিন্ন তিন ধরণের কোর্টে খেলা হয়। পিচে বৈচিত্র, কন্ডিশন এই ব্যাপারগুলো না থাকলে খেলাটাই তো একঘেঁয়ে মনে হবে। কেউ ঘাসের কোর্টে চ্যাম্পিয়ন, কেউ মাটির কোর্টে। তারপরও তারা গ্রেট খেলোয়াড়।’

আহমেদাবাদ টেস্টের ক্ষেত্রেও এই কথাটাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ইংল্যান্ড তাঁদের স্পিন দুর্বলতার কাছেই মার খেয়েছে। আজহারউদ্দীনের সময় থেকে ভারতে এই দশা বিভিন্ন দলের হয়ে আসছে। এখানে ক্রিকেটের স্পিরিটকে টেনে এনে ব্যাটসম্যানদের দায় এড়ানোটাকে চাইলে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র সাথে তুলনা করা যায়! ভদ্রলোককে ঘুমাতে দিন, তাঁকে শুধু শুধু টেনে আনবেন না সব জায়গায়।

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...