তোমার লাগি সহিয়াছি সব ঝড়

অদিতি মেয়েটা দেখছিল তাঁর মা কিভাবে চিন্তায় পড়ে যাচ্ছিলেন। চিন্তার কারণটাও সে দেখছিল, টিভি স্ক্রিনে। গ্যাবাতে কারা যেন একের পর এক বল ছুঁড়ে যাচ্ছে আর তাঁর বাবা সেটা ঠেকিয়ে দিচ্ছে শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে। একটা একটা বল, এক একটা আঘাত - অস্ট্রেলিয়া থেকে মোটামুটি ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে একটা টিভির সামনে বসে সেই প্রত্যেকটা বলের আঘাত যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল চেতেশ্বর পূজারার পরিবারকেও। তখন অদিতি একটা বেশ বুদ্ধি বের করে ফেলে। সে বলে, ‘বাবা যখন আসবে, বাবা যেখানে যেখানে ব্যাথা পেয়েছে আমি সেখানে আদর করে চুমু দিয়ে দেব, বাবা ঠিক ভাল হয়ে যাবে।’

অদিতি মেয়েটা দেখছিল তাঁর মা কিভাবে চিন্তায় পড়ে যাচ্ছিলেন। চিন্তার কারণটাও সে দেখছিল, টিভি স্ক্রিনে। গ্যাবাতে কারা যেন একের পর এক বল ছুঁড়ে যাচ্ছে আর তাঁর বাবা সেটা ঠেকিয়ে দিচ্ছে শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে। একটা একটা বল, এক একটা আঘাত – অস্ট্রেলিয়া থেকে মোটামুটি ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে একটা টিভির সামনে বসে সেই প্রত্যেকটা বলের আঘাত যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল চেতেশ্বর পূজারার পরিবারকেও।

তখন অদিতি একটা বেশ বুদ্ধি বের করে ফেলে। সে বলে, ‘বাবা যখন আসবে, বাবা যেখানে যেখানে ব্যাথা পেয়েছে আমি সেখানে আদর করে চুমু দিয়ে দেব, বাবা ঠিক ভাল হয়ে যাবে।’

ঐতিহাসিক ঐ টেস্টটার পর ব্রিসবেনের বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে চেতেশ্বর পূজারা কথা বলেছেন ঠিক কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল তাঁর পরিবার। সেই ‘কিসের মধ্যে’র কিছুটা কিন্তু পূজারার হাতের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছিল। আঙুলে বেশ কিছু ব্যান্ডেজ দেখা যাচ্ছিল, অনেকটাই ফুলে গেছে বোঝা যায়। কাঁধের অংশটাও বেশ ফোলা – অস্ট্রেলিয়ান বোলারদের শিল্প পূজারার শরীরের জায়গায় জায়গায় ফুটে উঠছিল বেশ ভালভাবেই!

পূজারা ব্রিসবেনে দাঁড়িয়েই বলেছেন, সারারাত তিনি ঘুমাতে পারেননি। আঙুলটা ব্যাথায় নাকি টনটন করছিল, এক মুহূর্তেরও জন্যে চোখে পাতা এক করতে পারেননি। কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে, দু:খটা কিছুটা হলেও এখন নাকি কম মনে হচ্ছে পূজারার। আর আমরা জানি, সেই কমে যাওয়া দুঃখের সাথে পূজারার গর্ববোধও আছে – অস্ট্রেলিয়া জয় করার পর তা তো লাগবেই!

পূজারার মেয়ের কথা বলছিলাম, পূজারার দাওয়াই যার কাছে তৈরি করে রাখা আছে। মেয়ের এই দাওয়াইয়ের কথা শুনে পূজারা বলেছেন, ‘ও যখন পড়ে গিয়ে ব্যাথা পায়, তখন আমি এটা করি। তো ও বিশ্বাস করে নিয়েছে আদর করে দিলেই সব সেরে যায়।’

বাংলায় বহু পুরনো এক গান আছে না, ‘আন্টির কাছে গিটার শিখে আন্টিকেই হারাব।’ পূজারার দেওয়া দাওয়াই এবার তাঁর মেয়ে দেখা যাচ্ছে পুজারাকেই দিচ্ছে!

কিন্তু বাবার আদরের ছোট্ট মেয়ে তো এই খারাপ পৃথিবীর এম.আর.আই, এক্স-রে এসব সম্বন্ধে জানেনা, এটাও তো জানেনা একটা শক্ত ক্রিকেট বল যখন মাংসপিন্ডে আঘাত করে, কি অবর্ণনীয় যন্ত্রণা করে ওঠে সেখানে! না জানুক, পৃথিবীটা তো না জানলেই সুন্দর, না চিনলেই সম্মোহনের যোগ্য!

পূজারার ব্যাপারটা অবশ্য অন্য সব ক্রিকেটারের থেকে আলাদা। টেনিস বলে ব্যাট আর বল ঘুরিয়েই তিনি ক্রিকেটের পাঠোদ্ধার করেননি, ক্রিকেটটা পূজারার কাছে সবসময়ই বল আসবে আর বলকে মোকাবেলা করতে হবে এমন একটা ব্যাপার। তাতে কিন্তু, পূজারাকে খেসারতও দিতে হয়। আপনি জেনে অবাক হবেন, পূজারার শরীরের এমন কোন জায়গা নেই যেটাতে ক্রিকেট বল এসে ক্ষত দিয়ে যায়নি।

পুজারা ক্রিকেটকে বলেন তাঁর প্রেম, ক্রিকেট বল সে হিসেবে যদি ব্যাটসম্যান পূজারার প্রেমিকা ধরে নিই, তবে প্রেমিকার এমন চুম্বন আর কোন প্রেমিক চাইবে বলে মনে হয়না। যে চুম্বনের ‘আফটার-ইফেক্ট’-এ মাসল সমস্যা, টেন্ডন ভেঙে যাওয়া, টিস্যু ক্ষয়ে যাওয়া, হাড় ভেঙে যাওয়া, লিগামেন্ট ছিড়ে যাওয়া- হেন আঘাত নেই যা পূজারা সয়ে যাননি।

এর কিছু কিছু কিন্তু পূজারার সাথে স্থায়ী বসতি গড়ে ফেলেছে। তবুও নিখাদ সুবোধ প্রেমিকের মত নিজের প্রেমকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন পূজারা। দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে সেই টেস্টটার কথা মনে আছে? দিল্লীতে সেই টেস্টটাতে তিনি ৭০ রান করেছিলেন ভাঙা আঙুল নিয়ে।

আঙুল তো ভেঙ্গেই গেছে, এরপর সাথে যোগ হল হ্যামস্ট্রিংয়ের টান- যেকোন খেলার অ্যাথলেটরা যেটাকে বলে থাকে সবচাইতে জঘন্য ইনজুরি। এসব সয়েই তিনি মাঠে থেকেছেন, ক্রিকেট খেলেছেন, ব্যাট চালিয়েছেন। ক্রিকেট যদি জীবন হয়, পূজারা তাহলে সে জীবনের অতন্দ্র সেনানী!

অস্ট্রেলিয়ার সাথে সেই দ্বিতীয় ইনিংসটা বাদে পূজারা কখনও পৃথিবীকে বুঝতে দেননি, তিনি কতটা আঘাতপ্রাপ্ত। এর আগেও তিনি আঘাত পেয়েছেন,লম্বা শ্বাস নিয়েছেন, আস্তে করে হেঁটে ক্রিজে ফিরে এসেছেন, বোলারের দিকে চকিতে এক পলক দেখেছেন, গার্ডটা ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিয়েছেন আর পরের বলটা কিভাবে খেলবেন সেদিকে মনোযোগ দিয়েছেন। এসবই যেন পুজারার রুটিন কাজ, পূজারা তো আসলে এমনই, ‘আমি তোমারও লাগি সহিয়াছি সব ঝড়।’

তবে এত কিছুর পরও কিন্তু তিনি পেইন-কিলার নেননা কখনও, ‘খুব ছোটবেলা থেকেই আমার পেইন-কিলার খাওয়ার অভ্যাস নেই। সেজন্যে আমি ব্যাথা সহ্য করে নিতে পারি অনেক বেশি। এটা এমন কিছু নয়, দীর্ঘদিন ধরে না খেলে এটা আপনিও পারবেন।’

পূজারা বলেছেন এটা কঠিন কিছু নয়, সাথে বাতলে দিয়েছেন দীর্ঘদিনের এক চর্চার উপায়ও। কিন্তু তা কি ‘পূজারা’ না হলে করা যায়?

তবে এত কিছু সয়ে যাওয়া পূজারাও স্বীকার করেছেন ব্রিসবেন কিছুটা আলাদাই ছিল, ছিল অনেক কঠিনও, ‘আমি দুই পাশ থেকেই চ্যালেঞ্জ দেখছিলাম। প্যাট কামিন্স তো পিচের ফাটা অংশে বল ফেলছিল যাতে বল পড়ে লাফিয়ে ওঠে। কামিন্সের এই স্কিলটা অবশ্য অনেক বেশি আছে। সেই বল ঠেকাতে আমি হাত ওঠালেও শঙ্কা ছিল তা গ্লাভসের ওপরে লাগবে। কিন্তু, তাঁর চাইতেও বড় শঙ্কা ছিল আমি আউট হয়ে গেলে কি হবে। আমি উইকেট হারাতে চাচ্ছিলাম না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, যা হয় হোক। আমি আমার শরীর দিয়ে বল ঠেকানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।’

আপনার সেই সিদ্ধান্ত তো ইতিহাস হয়ে গেছে, চেতেশ্বর অরবিন্দ পূজারা!

আরও পড়ুন

Leave A Reply

Your email address will not be published.