কাঠগড়ায় হারানো অমিত সম্ভাবনা

ম্যাচের তারিখ কিন্তু ১১ ডিসেম্বর। অথচ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া তাকে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা শেষ হতে আরও তিনদিন বাকি। অর্থাৎ, রাজ্যদলের হয়ে নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন পমার্সব্যাক। অবাক করা ব্যাপারই বটে! ইনিংসের বিশ বল বাকি থাকতে ব্যাটিংয়ের পালা আসল তার। কিন্তু কিট তো নেই। যার জায়গায় অভিষেক, তার কিট ধার নিয়েই নেমে পড়লেন ব্যাটিংয়ে। পেছনে লেখা ‘Dodge’ (ব্র‍্যাড হজের ডাকনাম)!

হঠাৎ মনে হল, এরকম উদ্ভট কারণে দল থেকে বাদ পড়া নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করা যাক। অনেকগুলো অবশ্য সবারই জানা, যেমন বিলি মিডউইন্টারকে ডব্লিউ জি গ্রেসের কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া, কিটব্যাগ না আনায় অ্যারন ফিঞ্চের বাদ পড়া ইত্যাদি।

কিন্তু, চোখ আটকে গেল একটা ঘটনায়। ঘটনাটাকে সবচেয়ে উদ্ভটভাবে বাদ পড়া না বলে সবচেয়ে উদ্ভট অভিষেক বললেই বরং ভালো হবে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র লুক পমার্সব্যাচ, যার নাম প্রথম শুনেছিলাম একবার ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) চলাকালে একটা নেতিবাচক কারণে। সেটা পরে বলছি।

কয়েক বছর আগেও সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে পাওয়ার হিটার হিসেবে ভালোই নাম ছিল লুক পমার্সব্যাচের। ২০০৭-০৮ ঘরোয়া মৌসুমে সেবার দুর্দান্ত ফর্মে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার এই ব্যাটসম্যান। প্রায় একশো গড়ে পাঁচ ইনিংসে করে ফেলেছেন ৩৯৫ রান। শন মার্শ আর পমার্সব্যাক মিলে ঠিক করলেন একটু গলা ভেজাবেন। কিন্তু একটু বেশিই পান করে ফেললেন। ফলাফল, দুজনেই প্রথম একাদশ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহিস্কৃত।

কী আর করা! অগত্যা ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় একাদশের হয়ে খেললেন ভিক্টোরিয়ার দ্বিতীয় একাদশের বিপক্ষে। ৯৭ বলে করলেন ১১৫, ভিক্টোরিয়া হারল ইনিংস ব্যবধানে।

এর মাঝে চ্যাপেল-হ্যাডলি ট্রফি খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছে নিউজিল্যান্ড। পমার্সব্যাচ সুযোগ পেলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া চেয়ারম্যান একাদশের হয়ে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার। ৬৫ বলে করলেন ৮৮, নিউজিল্যান্ড হারল ৭ রানে।

চ্যাপেল-হ্যাডলি ট্রফি শুরু হওয়ার আগে ১১ ডিসেম্বর পার্থের ওয়াকাতে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। আমাদের নায়ক পমার্সব্যাক ভাবলেন ম্যাচটা দেখে আসা যায় মাঠে বসে। যেই ভাবা সেই কাজ। সাথে নিলেন বান্ধবীকে।

ম্যাচের আগে বাঁধলো আরেক ঝামেলা। দল পরিকল্পনা করেছে স্টুয়ার্ট ক্লার্ককে বাদ দেবে। ওয়ার্ম-আপ করার সময় ব্র‍্যাড হজ কাঁধে চোট পেলেন। এখন সমস্যা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার খেলাতে হবে অ্যাডাম গিলক্রিস্টসহ পাঁচ ব্যাটসম্যান আর ছয় বোলার। ছয় বোলার নিয়ে কেউ খেলে নাকি?

মহা দুশ্চিন্তা তো! পমার্সব্যাচ কাছাকাছিই আছে জেনে টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে ডেকে পাঠালো। এক বন্ধুর মাধ্যমে এটা জানতে পেরে প্রথমে ভাবলেন মজা নাকি! কিন্তু ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি ড্রেসিংরুমে যান পমার্সব্যাক। চ্যানেল নাইনকে বলেছিলেন যে, গাড়ি লক করে আসতেই ভুলে গিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু কিট তো নেই। তার ভাই গ্যাভিন দৌঁড়ে গেলেন কিট আনতে। কিন্তু গ্যাভিন ওয়াকাতে পৌঁছুতে পৌঁছুতে বেশ দেরি হয়ে গেছে৷ ততক্ষণে মাইকেল ক্লার্ক টসে জিতে ব্যাটিং নিয়ে ফেলেছেন। অ্যাডাম ভোজেস, অ্যাশলি নফকে আর শন টেইটের সাথে অভিষেক হয়ে গেছে পমার্সব্যাচেরও।

ম্যাচের তারিখ কিন্তু ১১ ডিসেম্বর। অথচ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া তাঁকে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা শেষ হতে আরও তিনদিন বাকি। অর্থাৎ, রাজ্য দলের হয়ে নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন পমার্সব্যাচ। অবাক করা ব্যাপারই বটে!

ইনিংসের বিশ বল বাকি থাকতে ব্যাটিংয়ের পালা আসল তার। কিন্তু কিট তো নেই। যার জায়গায় অভিষেক, তাঁর কিট ধার নিয়েই নেমে পড়লেন ব্যাটিংয়ে। পেছনে লেখা ‘Dodge’ (ব্র‍্যাড হজের ডাকনাম)!

অভিষেকটা কিন্তু খারাপ হয়নি৷ শেষদিকে নেমে ৭ বলে ১৫, মার্ক গিলেস্পিকে মারা একটা ছয়ের সাহায্যে৷ অস্ট্রেলিয়া ৪ উইকেটে করল ১৮৬।

নিউজিল্যান্ড নয় বল বাকি থাকতে ১৩২ রানে অলআউট, অস্ট্রেলিয়া জিতল ৫৪ রানে।

এমন উদ্ভট অভিষেকের পর আর অস্ট্রেলিয়ার জার্সি গায়ে চাপানো হয়নি তার। অর্থাৎ নিজের নামের অস্ট্রেলিয়ার জার্সি পরা আর হয়ে ওঠেনি তাঁর।

পুরো ক্যারিয়ারে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। হিট অ্যান্ড রান কেসে দোষী সাব্যস্ত হওয়া, পাবলিক অফিসারকে হেনস্তা করা, পুলিশকে বাধা দেয়া, আইনি হেফাজত থেকে পালানো – কী করেননি পমার্সব্যাচ!

২০০৮ ও ২০০৯ সালের আইপিএলে খেলেছিলেন কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের হয়ে। ২০১১ তে চলে যান রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরে। ২০১২ তে ঘটান আরও এক ঘটনা।

হোটেলে এক তরুণীকে শ্লীলতাহানি ও তাঁর বাগদত্তাকে হেনস্তা করার অভিযোগে গ্রেফতার হন পমার্সব্যাচ। পরে কোর্টের বাইরে মীমাংসা করে নেয় উভয়পক্ষ। পরের মৌসুমেই অবশ্য কিংস ইলেভেন তিন লাখ ডলারে কিনে নেয় তাঁকে। ২০১৪ সালে মানসিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ক্রিকেট ছাড়েন লুক পমার্সব্যাচ।

গত ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতেই আবারও নেতিবাচক কারণে শিরোনামে আসেন পমার্সব্যাচ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সব হারিয়ে এখন নিজের গাড়িতে থাকছেন তিনি। দুটো আলাদা মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হত তাকে। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হওয়ায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় তাঁর নামে। নববর্ষের দিনে একটা শপিং সেন্টারের বাইরে থেকে বাইসাইকেল চুরি আর তার কয়েকদিন পর একটা লিকার শপ থেকে ১০ প্যাক প্রি-মিক্সড স্পিরিট চুরির অভিযোগ আছে লিউক পমার্সব্যাচের বিরুদ্ধে।

নতুন বছরেও তিনি এর ধারাবাহিকতা রেখেছেন। এবার ২০২১ সালে এসে তিনি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস মিলিয়ে দক্ষিণ পার্থে গলফ ক্লাবে চুরি করেছেন। পোশাক ও গহনা লুট করেছেন। তার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ড্রাগ নেওয়ারও অভিযোগ আছে।

অমিত সম্ভাবনার কি নিদারুণ পরিণতি!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আরও পড়ুন
মন্তব্যসমূহ
Loading...